হবিগঞ্জে মাদরাসায় গিয়ে ১০ বছরের শিশু নিখোঁজ, ৯ দিন পর কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি!
দশ বছরের এক ফুটফুটে শিশু নিখোঁজ হয়ে গেল মাদ্রাসা থেকে। চারদিকে স্বজনদের আহাজারি, মাইকিং, মানববন্ধনে এলাকাবাসীর ক্ষোভ। অথচ যার আঙিনা থেকে শিশুটি হাওয়া হয়ে গেল, সেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের হুঁশ ফিরতে সময় লাগল পুরো নয় দিন! নয় দিন পর পত্রিকায় একটি ‘হারানো বিজ্ঞপ্তি’ দিয়েই কি তবে দায় সারল দারুল হিকমাহ তা'লীমুল কুরআন একাডেমি?
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ৩য় শ্রেণির ছাত্রী ফাবিয়া তাবাসসুম মীমের এই রহস্যজনক নিখোঁজ সংবাদে এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে শুধুই প্রশ্ন আর একধরনের তিক্ত মন্তব্য। তাঁরা বলছেন,বিজ্ঞপ্তি দিতেও কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গ্রিন সিগন্যালের জন্য ৯ দিন বসে থাকতে হয়?
জানা গেছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর মাগরিবের সময় সহপাঠীদের সঙ্গে হাসতে হাসতে মাদ্রাসায় গিয়েছিল চতুরঙ্গ রায়ের পাড়ার খোয়াজ আলী মিয়ার ১০ বছরের মেয়ে মীম। এশার আজানের পর ছুটির ঘণ্টা বাজল, সহপাঠীরা যার যার বাড়ি ফিরল, কেবল ফিরল না মীম।উদ্বিগ্ন পরিবার মাদ্রাসায় ছুটে গিয়ে দেখতে পায় বেনজির এক দৃশ্য—পড়ে আছে মীমের বই, খাতা, ব্যাগসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। মানুষটি নেই, কিন্তু তার সব কিছু যেন টেবিলেই সাজানো!
পরিবারের দাবি, সহপাঠীরা মীমকে বিকেল পর্যন্ত মাদ্রাসায় দেখেছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বলছে এক অদ্ভুত কথা—সকালে নাকি মীম প্রবেশ করেছে আর বিকেল ৩টার পর তাকে আর দেখা যায়নি! সিসিটিভি ফুটেজে সকালে ঢোকা আর বিকেলে বের হওয়ার দৃশ্য মেলে ঠিকই, কিন্তু এরপর সে কোথায় বা কার সাথে বাতাসে মিলিয়ে গেল, সে তথ্য নাকি সিসিটিভিতেও নেই, কর্তৃপক্ষের পেটেও নেই!
মীমকে ফিরে পেতে যখন পরিবার থানা-পুলিশ করছে, পাড়া-প্রতিবেশীরা রাস্তায় নেমে তীব্র প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করছে, তখন সেই মানববন্ধনেও দেখা মেলেনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কারও!
এ নিয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠলে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন যে যুক্তি দিলেন, তা শুনে সচেতন মহল বিস্ময়ে বাক্রুদ্ধ। প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য, "ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পেতেই ৯ দিন লেগে গেছে! এর মধ্যে আমরা মিলাদ মাহফিল করেছি, বিভিন্নভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছি।"
সচেতন মানুষের সোজা প্রশ্ন—একটি ১০ বছরের অবুঝ শিশু গায়েব হয়ে যাওয়ার পর যেখানে মিনিটে মিনিটে তটস্থ থাকার কথা, মাইকিং আর প্রচারের বন্যা ভাসিয়ে দেওয়ার কথা, সেখানে মিলাদ মাহফিল আর 'ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত'-এর দোহাই দিয়ে ৯ দিন সময় ক্ষেপণ কেন? এটা কি নিছকই গাফিলতি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অন্ধকার?
কান্নায় ভেঙে পড়া বাবা-মায়ের এখন একটাই আকুতি—যেকোনো মূল্যে ফিরিয়ে দেওয়া হোক তাদের কলিজার টুকরোকে। কিন্তু ৯ দিনের এই নীরবতা আর কর্তৃপক্ষের সন্দেহজনক রহস্যময় ঢিলেঢালা ভাব পুরো ঘটনাটিকে ফেলে দিয়েছে এক বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
১০ বছরের অবুঝ শিশু মীম কি কোনো গভীর চক্রান্তের শিকার, নাকি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের এই ঢিলেঢালা ভাব আড়াল করছে বড় কোনো সত্যি? এই প্রশ্নের দ্রুত ও কার্যকর জবাব খুঁজছে এখন পুরো বানিয়াচংবাসী।
স্বপন রবি দাশ/ নীরব চাকলাদার / প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: