কালো টাকা ও রাজনীতির দাপট: বিপন্ন শিমুল বাগান ও জাদুকাটা সেতু

কালো টাকা ও রাজনীতির দাপট: বিপন্ন শিমুল বাগান ও জাদুকাটা সেতু

লতিফুর রহমান রাজু. সুনামগঞ্জ

২৬/০৫/২০২৬ ১২:৪৯:৫৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শান্ত নদী জাদুকাটার তীরে পরিবেশ ধ্বংসের উন্মত্ত খেলা চলছে বছরের পর বছর ধরে। তবে প্রতিবারই কোন এক অদৃশ্য কারণে মাঝপথে থেমে যায় প্রশাসনের আইনগত পদক্ষেপ। রাজনৈতিক দাপট আর কালো টাকার নিচে চাপা পড়ে যায় পরিবেশ রক্ষার সব আকুতি।


এবার সেই বলির পাঁঠা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে অবস্থিত দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট ‘শিমুল বাগান’ এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন জাদুকাটা সেতু। নদীখেকোদের সীমাহীন লোভের কারণে বিশ্ববিখ্যাত এই শিমুল বাগান এখন বিলুপ্তির পথে, আর হুমকির মুখে পড়েছে সরকারের মেগা অবকাঠামো জাদুকাটা সেতু।


স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে জাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে অবাধে বালু উত্তোলন করছে। এতে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিনের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই শিমুল বাগান প্রতি বছর বসন্তে লাল ফুলের চাদরে ঢেকে যায়, যা দেখতে দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক ভিড় করেন। কিন্তু এখন একের পর এক শিমুল গাছ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


শুধু শিমুল বাগানই নয়, বালু খেকোদের আগ্রাসনে হুমকির মুখে পড়েছে জাদুকাটা নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুটি। ইতিমধ্যেই সেতুর ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজার ও ‘সেইভ মেশিন’ দিয়ে তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাতের আঁধারে এবং ভোররাতে নদীর তীরবর্তী গড়কাটি এলাকা থেকে শুরু করে ঝালরটেক ও ঘাঘটিয়া গ্রামের পাকা রাস্তার মাথা পর্যন্ত দেদারসে চলছে বালু লুটের মহোৎসব। নদী তীর কেটে, গর্ত করে কোয়ারি বানিয়ে শত শত ড্রেজার চালানো হচ্ছে। আর এই পরিবেশ বিধ্বংসী সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে ঘাঘটিয়া গ্রামের রানু মেম্বার ও মানিগাঁও গ্রামের হাসানের নাম। অবশ্য রানু মেম্বার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।


তবে গত ২৫ মে এলাকাবাসী ওমরপুরের বাসিন্দা মেহরাব নামের এক ব্যক্তিকে একটি স্টিল বডি নৌকাসহ আটক করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদে মেহরাব স্বীকার করেন, রানু মেম্বার ও হাসানই তাকে এই নৌকা বালু বোঝাই করে দিয়েছেন।


এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে ইতিমধ্যেই এলাকার ২০ থেকে ২৫টি গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়েছেন বহু মানুষ। হুমকিতে রয়েছে নদীর তীরের গুচ্ছগ্রামটিও। জাদুকাটা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল ও নাসির মিয়া বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই পাড় কাটার বিরুদ্ধে। এই তাণ্ডব বন্ধে আমরা নদীর তীরে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছি।’


এলাকাবাসীর তীব্র ক্ষোভ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য দিবালোকে এই লুণ্ঠন চললেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে। লোকদেখানো দু-একটি অভিযানের পর পরিস্থিতি আবার আগের রূপ নেয়।


অবশ্য তাহিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম সান্তনু দাবি করেন, ‘আমরা অতীতের মতোই তৎপর রয়েছি। রানু মেম্বার ও হাসানসহ জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ চলছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।’


বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নাজমুল ইসলাম ও তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম প্রথম সিলেটকে জানান, জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।


এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন প্রথম সিলেটকে বলেন, ‘আমি সুনামগঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জাদুকাটা ও ধোপাজান নদীতে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধের চেষ্টা করছি। এ পর্যন্ত ৪৬টি মামলা ও ২৯৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। রানু মেম্বারের নামেই অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। খুব শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান প্রথম সিলেটকে বলেন, ‘ঈদের পর আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


পরিবেশপ্রেমী ও সচেতন মহলের মতে, রাজনৈতিক দাপট আর কালো টাকার খেলা বন্ধ না হলে অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান। যাদুকাটা সেতু ও শিমুল বাগান রক্ষায় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

এল আর রাজু/ ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad