শব্দদূষণে অতিষ্ঠ হাওরপাড়ের বাসিন্দারা
টাঙ্গুয়ার হাওরে উচ্চশব্দে নাচ-গানের মহোৎসব
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশের দ্বিতীয় ‘রামসার সাইট’ সুনামগঞ্জের ঐতিহাসিক টাঙ্গুয়ার হাওরে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির আমেজে একদল পর্যটক ও কিশোরদের উচ্চশব্দে বক্স বাজিয়ে নাচ-গানের কারণে চরম অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন হাওরপাড়ের সাধারণ বাসিন্দারা; ঈদের আনন্দ উদযাপন করার নামে আজ শুক্রবার (২৯ মে) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলার পর্যটন সমৃদ্ধ জয়পুর গ্রাম সংলগ্ন নদী ও টাঙ্গুয়ার হাওরের কেন্দ্রীয় ওয়াচ টাওয়ার (পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ৩০টি বড় ইঞ্জিনের নৌযান বা ট্রলারে কিশোর-তরুণদের এমন উন্মত্ত কর্মকাণ্ড প্রকাশ্য দিবালোকে করতে দেখা যায়।
স্থানীয় জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা ও প্রতিবেশ সচেতন পরিবেশকর্মী আহম্মদ কবীর হাওরের পরিবেশের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল একটি সাধারণ জলাশয় বা বিনোদন কেন্দ্র নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের গৌরব এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক রামসার সাইট হিসেবে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সংরক্ষিত এলাকা; কিন্তু দুঃখের বিষয়, ঈদের আনন্দ উদযাপনের নামে একশ্রেণির দায়িত্বজ্ঞানহীন পর্যটক ও স্থানীয় ট্রলার মালিকরা উচ্চশব্দে সাউন্ড বক্স ও মাইক বাজিয়ে দিনভর কুরুচিপূর্ণ নাচ-গান করছে। এই মারাত্মক শব্দদূষণের কারণে হাওরপাড়ের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এবং হাওরের মূল প্রাকৃতিক ও শান্ত পরিবেশ মারাত্মকভাবে ধ্বংস হচ্ছে; আমরা বিষয়টি দেখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের মাধ্যমে অবগত করেছি।”
উল্লেখ্য, বিগত প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো প্রথাগত ইজারাপ্রথা সম্পূর্ণ বাতিল করে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে ১৯৯৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার টাঙ্গুয়ার হাওরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ECA) হিসেবে ঘোষণা করেছিল; পরবর্তীতে ২০০০ সালে এটি বিশ্বের দরবারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘রামসার সাইট’ হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃতি পায় এবং ২০০১ সাল থেকে এই হাওরের সার্বিক প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার পবিত্র দায়িত্ব সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার পর বর্তমানে এটি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দিগন্ত বিস্তৃত স্বচ্ছ নীল জলরাশির অপরূপ এই টাঙ্গুয়ার হাওরের ভৌগোলিক অবস্থান মূলত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর এবং মধ্যনগর উপজেলার বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত; দূর থেকে তাকালেই ওপারে ভারতের মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়, মাথার ওপরে নীল আকাশ আর নিচে হাওরের নীলাভ জলের অপূর্ব মিতালী যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করে, যা মূলত বিশ্বজুড়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য ও নৈসর্গিক আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ভরা বর্ষা মৌসুমে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই সুবিশাল হাওর পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে এক অপরূপ ও মায়াবী সৌন্দর্যে রূপ নেয় এবং এই জলমগ্ন সৌন্দর্য উপভোগ করতেই প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো ধরনের সঠিক নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত এই টাঙ্গুয়ার হাওরের চিরচেনা পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত ও নষ্ট হচ্ছে; বিশেষ করে ইঞ্জিনের উচ্চ শব্দ ও মাইকের আওয়াজের কারণে হাওরের শীতকালীন পরিযায়ী পাখি, স্থানীয় বিলুপ্তপ্রায় জলজ উদ্ভিদ, মা মাছ এবং বন্যপ্রাণীসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য এখন চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে। উদ্ভূত এই ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতি ও শব্দদূষণের বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের একাংশের উচ্চশব্দে গান-বাজনা ও পরিবেশ নষ্ট করার বিষয়টি ইতোমধ্যে আমাদের প্রশাসনের কঠোর নজরে এসেছে; হাওরের পরিবেশের পবিত্রতা ও শান্তি বজায় রাখতে টাঙ্গুয়ার হাওরের মূল ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় সার্বক্ষণিক দায়িত্বরত সরকারি আনসার সদস্যদের টহল তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি করার জন্য বলা হয়েছে এবং আইন অমান্যকারী ট্রলারগুলোর বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা নির্দেশ দিয়েছি।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: