লাখাইয়ে খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

তদন্ত দাবি

লাখাইয়ে খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ

২৪/০৬/২০২৬ ১৭:২১:১৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়নের সাতাউক ও মুড়িয়াউক খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অতিদরিদ্রদের জন্য পরিচালিত কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকের উপস্থিতি, কর্মদিবস, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং প্রকৃত কাজের পরিমাণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।


জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মুড়িয়াউক ইউনিয়নে দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।


সাতাউক উত্তর গ্রাম থেকে বলভদ্র নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য মোট ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিক মজুরি বাবদ প্রায় ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৭ জন শ্রমিকের ৪০ কর্মদিবস কাজ করার কথা রয়েছে।


অন্যদিকে, সুতাং নদী থেকে তেঘরিয়া পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ৯৯ লাখ ৫১ হাজার ৯১০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে প্রায় ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা শ্রমিক মজুরির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেখানে ২৯৮ জন শ্রমিকের ৪০ দিন কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।


তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে নির্ধারিত সংখ্যক শ্রমিক দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কম শ্রমিক দিয়ে কাজ পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক উপস্থিত না থাকলেও তাদের নামে হাজিরা দেখানো হচ্ছে এবং নির্ধারিত পরিমাণ মাটি খনন ছাড়াই কাজের অগ্রগতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অনিয়মের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


সূত্র জানায়, সাতাউক ও মুড়িয়াউক খাল পুনঃখনন প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নোমান মিয়া এবং প্যানেল চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস।


তবে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বক্তব্যে অসঙ্গতি দেখা গেছে। চেয়ারম্যান নোমান মিয়ার দাবি, সাতাউক খালের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে শ্রমিকরা প্রায় ৩৫ দিন কাজ করেছেন। বিপরীতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাকিব জানান, ওই প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৮৬ শতাংশ এবং শ্রমিকরা ৩৪ দিন কাজ করেছেন।


মুড়িয়াউক খালের ক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের দাবি, শ্রমিকরা ৩৮ দিন কাজ করেছেন। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অগ্রগতি ৮১ শতাংশ এবং শ্রমিকরা ৩৮ দিন কাজ করেছেন।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুড়িয়াউক খালের কাজ বন্ধ রয়েছে। উপস্থিত শ্রমিকরা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে কয়েক দিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে কয়েকজন শ্রমিক দাবি করেন, তারা ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন।


অন্যদিকে, সাতাউক খালের কাজ চলমান রয়েছে বলে দাবি করা হলেও দুপুরের দিকে সেখানে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। খাল থেকে কিছু দূরে কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, সকালে কাজে এলেও পরে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে কাজ শেষ হয়ে গেছে। ফলে তারা অল্প সময় কাজ করে বাড়ি ফিরে যান।


এক নারী শ্রমিক আরেকজন স্বীকার করেন যে, তিনি তার স্বামীর পরিবর্তে কাজ করছেন। অপর এক শ্রমিক বলেন, ‘চার-পাঁচ দিন পরপর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিস থেকে লোক এসে হাজিরা নিয়ে যায়।’


এ বিষয়ে মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প সভাপতি নোমান মিয়া বলেন, ‘কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। সাতাউক খালের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে এবং মুড়িয়াউক খালের অবশিষ্ট কাজ বৃষ্টি কমলে শেষ করা হবে।’


উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাকিব বলেন, ‘সাতাউক খালের ৮৬ শতাংশ এবং মুড়িয়াউক খালের ৮১ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শ্রমিকদের কাজে কিছু ঘাটতি ও তদারকির সমস্যা রয়েছে। অনেক সময় একজনের পরিবর্তে অন্যজন কাজ করেন, এমন ঘটনাও ঘটে। তবে উপস্থিতি অনুযায়ীই শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করা হবে।’


স্থানীয় সচেতন মহল প্রকল্প দুটির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


রোদ্দুর রিফাত

মন্তব্য করুন: