'চোর' সাজানোর অপচেষ্টা
সুনামগঞ্জে পূর্ব শত্রুতার জেরে যুবককে অপহরণ ও গাছে বেঁধে নির্যাতন
সুনামগঞ্জে পূর্ব শত্রুতার জেরে হেলাল (২৮) নামের এক যুবককে শ্বশুরবাড়ি থেকে অপহরণ করে দুই দিন ধরে দফায় দফায় পাশবিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনকারীরা ঘটনা ধামাচাপা দিতে ওই যুবকের মাথার চুল কেটে ‘মোটরসাইকেল চোর’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে বলে জানা গেছে। গত ৭ জুন দিবাগত রাতে শুরু হওয়া এই নৃশংসতার পর, নিখোঁজের দুদিন পর ১০ জুন তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। গতকাল (১১ জুন) সন্ধ্যায় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি নিজ জিম্মায় পরিবারের কাছে ফিরে আসেন।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ জুন রাত আনুমানিক ১১টার দিকে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হেলালকে তার শ্বশুরবাড়ি রামনগর এলাকা থেকে একদল দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে উপজেলার শুকদেবপুর হাওর পাড় এলাকার তাহির মিয়ার বাড়িতে আটকে রাখা হয়। সেখানে সারারাত হাত-পা বেঁধে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
ভোররাতের দিকে হেলাল নিজের জীবন বাঁচাতে বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নির্যাতনকারীরা ধাওয়া করে এবং গ্রামে শোরগোল সৃষ্টি হয়। এ সময় গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে জড়ো হলে অপরাধীরা ঘটনা আড়াল করতে হেলালকে বাড়ির বাইরের একটি গাছে বেঁধে পুনরায় নির্যাতন করে। একই সাথে তারা গ্রামবাসীকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, তাকে ‘মোটরসাইকেল চোর’ হিসেবে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। এই নির্যাতনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে পোস্টকারীরা দ্রুত ভিডিওগুলো ডিলিট (মুছে ফেলা) করতে শুরু করে।
ভুক্তভোগীর ভাই ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে শুকদেবপুর গ্রামে পৌঁছানোর আগেই অপরাধীরা বিষয়টি টের পেয়ে যায়। পরদিন সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা হেলালকে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একটি টেম্পোতে করে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথিমধ্যে টেম্পোর ভেতরেও তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং একপর্যায়ে ব্লেড দিয়ে তার মাথার চুল কামিয়ে দেওয়া হয়। অপরাধীরা তাকে সুনামগঞ্জ থানায় সোপর্দ না করে শহরের একটি গোপন বাসায় আটকে রেখে দিনভর পুনরায় নির্যাতন চালায়। অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে একপর্যায়ে হেলাল অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
হেলাল অজ্ঞান হয়ে পড়লে গত ৮ জুন সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে অপরাধীরা তাকে সুনামগঞ্জের মল্লিকপুর বাস স্টেশনের পাশে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে জ্ঞান ফিরলে স্থানীয় বাসিন্দারা তার রক্তাক্ত অবস্থা দেখে সুনামগঞ্জ থানা পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় এবং সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করে।
নিখোঁজের দুই দিন পর ১০ জুন সকালে পরিবারের সদস্যরা হেলালের সন্ধান পান এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গতকাল ১১ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তাকে নিজ জিম্মায় মুক্ত করে আনেন।
এই নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগীর ভাই বলেন, "আমাদের এলাকায় এমন অমানবিক ঘটনা নজিরবিহীন। আমার ভাইকে শুধু অপহরণ ও নির্যাতনই করা হয়নি, বরং অপরাধ ঢাকতে চুরির নাটক সাজানো হয়েছে। এই ঘটনার মূল হুকুমদাতা এবং সরাসরি জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।"
এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
রকি ইসলাম / ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: