স্মৃতির তিরানব্বই-চুরানব্বই

স্মৃতির তিরানব্বই-চুরানব্বই

এনামুল কবির

২০/০৬/২০২৬ ২২:৫৫:২৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

এটা ছিল এই মধ্য জুন, ২৬ এর ঘটনা। আমরা যারা একদিন জগন্নাথপুর কলেজের ছাত্র ছিলাম, তাদের মধ্যে ৯৩-৯৪' ব্যাচে আমাদের সুহৃদ ও সতীর্থের সংখ্যা কম ছিল না। এবার সে-ই তাদের ক'জন ভালো একটা কাজ করেছে, প্রকাশ করেছে তাদের ব্যাচকৃত স্মারক- 'স্মৃতির পাতায়'। এখানে অবশ্য তাদের দায় শেষ হয়ে যায়নি, এই নিয়ে তারা আয়োজন করে মোড়ক-উন্মোচন অনুষ্ঠানেরও। আর একে কেন্দ্র করে আমিও কি না পুরনো সে বন্ধু ও সুহৃদবর্গের সাথে সেদিন (১৫ জুন, ২০২৬, মোমবার) মিলিত হয়েছিলাম। এটা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার। এখানে আমরা যতক্ষণ একসাথে ছিলাম, তখন কত কথা'ই না মনে পড়েছিল। লোকেরা বলে, মন নাকি পুরনোকে ভালবাসে; নিজে সে পুরাতন যন্ত্র বিশেষ এবং রক্ষণশীলতা তার কাজ। আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু অতীতের সঞ্চয় বলেও তো একটা কথা আছে, যদি আমরা এসবকে পাঠ বা স্মরণে নিয়ে আসতে চাই, তবে এর বাইরে সেটা কীভাবে সম্ভব! যদিও কেউ বলতে পারেন, পুরনো যা এখন এক সঞ্চয়ও বটে, এসব তো আগে থেকে জানা এবং জীবনের অভিজ্ঞতা বিশেষ, তাহলে কেন পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ ও পুনরাবৃত্তি? আমরা বলবো এসব কেবল একঘেয়ে বা বিরক্তির বিষয় নয়, এতে আশ্রয় খোঁজারও আছে নিজস্ব সার্থকতার দিক। লোকেরা স্মৃতির পাঠ বা ইতিহাস কি কেবল এমনিতে পড়ে? না, ব্যক্তির জন্য এটা কেবল তাঁর শখের পৃথিবী নয়; যে রুপান্তরের ভেতর আমরা এর মধ্যে গিয়েছি, সেটা একটা উত্তরজীবন ও নবজাগৃতিকে কি না ব্যাখ্যা করে। সে কারণে হলেও পুনরাবৃত্তির এই প্রশ্নটা পাঠ অত্যন্ত জরুরি। নিজের সাথে ব্যক্তিকে সংগ্রথিত হতেই হয়।


তাহলে আমার জন্য সামান্য হলেও সেদিন এই সুযোগ এখানে সৃষ্টি হয়েছিল, তাই আনন্দের সাথে সে রূপান্তরকেও মনে হয়েছিল কিছুটা বুঝতে শিখেছিলাম। আমরা আর এক জায়গায় স্থির- দাঁড়িয়ে থাকতে পারি! যাইহোক 'স্মৃতির পাতায়' এর এই দিনে আমার জন্য সেটা ছিল আরেক স্মৃতি সঞ্চয়ের দিন। অবশ্য এই আনন্দপূর্ণ দিনের যোগসূত্রের কারিগর ছিল মুকিম, সে-ই প্রথম আমাকে ফোনে জানিয়েছিল তাদের এই আয়োজনের কথা। তাকে তিরানব্বই-চুরানব্বই ব্যাচের একজন হিসেবে আগে থেকে চিনতাম, সে নিরিখে তার সাথে ছিল চেনাজানা। একটা সময় তাদের অন্য অনেকের সাথে দেখা না হলেও তার সাথে হতো ঠিকই, সে তখন জেলা শহর- সুনামগঞ্জে থাকতো, এদিকে তখন আমারও প্রায়ই যাওয়া হতো, তা-ই। সে মুকিম এখন পুরোদস্তুর সাংবাদিক। আর ফজর আলী? সে বড় সংক্রমণশীল মানুষ। বেশ হাসাতে পারে, চটকদার কথা ও কৌশলী মন্তব্যে পুরো কুটনীতিবিদ। এখন মনে হয় সে হাইওয়ে সড়কের পাশে বাড়ি করেছে। তাই অবস্থানগত সুযোগে তার সাথে প্রায় সময় দেখা হয়। যখন মুকিম বলেছিল, তার সাথে আছে ফজর আলীও, তখন বুঝে গিয়েছিলাম এখানে না বলার আপাত সুযোগ নেই। অতএব স্মৃতির এই পাতার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমাকে যেতে হবে। তাদের বলি, আসতে চেষ্টা করবো এবং কোনও অতিথি হিসেবে নয়। যে উদ্যোগ ও পরিসরের কথা হচ্ছে, আমরা বন্ধু ও সুহৃদেরা এখানে মিলিত হবো- এটাই তো আসল কথা। এখানে তখন কেবল দেখা নয়, আলাপ ও আড্ডা হবে; হৈচৈও। বললাম, তারিখ ও বার ভুলে যাবো না; আমি'ই তাদের ফোন দিবো- চিন্তার কারণ নেই। উল্লেখ যে, এর মধ্যে তাদের থেকে এটাও জেনেছিলাম যে, আমাদের দুই প্রবাসী বন্ধু- রিজিক ও লাকী- এখন দেশে, এটা ছিল আরও প্রাণিতকর সংবাদ। কতদিন হয় আমাদের দেখা নেই, এবার তাহলে সে সুযোগটা আমরা পাচ্ছি! এখানে মুকিম ও ফজর আলী'র সাথে পরবর্তীতে যোগ দিয়েছিল- দুলা, সেও তাদের সহপাঠী। ভালো নাম- দেলোয়ার হোসেন। সে এক গণমুখী মানুষ, তার যোগাযোগ দক্ষতা তাকে আলাদা একটা কর্তৃত্ব দেয়। বলতে গেলে এই অনুষ্ঠানে আমার অংশীজন হবার দৌত্যটা ছিল তাদের। বলি- কতদিন পর এরকম একটা উদ্যোগ ও সাক্ষাৎ আমাদের হৃদয়ের পুরো জানালাটাই কি না খুলে দিয়েছিল।


যদিও আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্ধীর জীবন- ছাত্রজীবন বলতে গেলে অনেকটা নির্ঝঞ্ঝাটই থাকে, পরীক্ষাভীতি ও ব্যতিক্রম বাদ দিলে তখন খুব একটা করার থাকে না। কমবেশ তারুণ্যের স্পর্ধাকে সঙ্গী করে আমরা তখন বেড়ে উঠি। এখনকার সময় বিচার করলে আমরা দেখবো, সেটা সবার ক্ষেত্রে একটা সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ফলে এখন আমাদের হয়তো সে-ই পরীক্ষা ভীতি নেই, তবে যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের নিজস্ব উষ্ণতা আছে- এর অংশীজনের দায় স্বীকার করতে হয়। স্বভাবত এর ভেতর দিয়ে আমাদের যেতে হয় এবং আমরা অভিজ্ঞতা পূর্ণ এক জীবন কাটাই। সে নিরিখে আমরা নৈমিত্তিক কিছু করি আর এসব ভাবি কালের জন্য ফেলে রাখি না। এখানে সেই ৩৩ বছর আগের আমরাও কেউ আর আগের শিক্ষার্থী নেই, এখন আছে নিজস্ব দায়; কাজ ও ব্যস্ততা। স্বভাবত আমাকেও সেদিন এরকম কিছু কাজ সেরে তবেই টমটমে গিয়ে বসতে হয়েছিল। গন্তব্য তো ছিল পূর্ব নির্ধারিত, অতএব সে মোতাবেক দেড়টার মধ্যে আমি সরকারি ডিগ্রি কলেজে গিয়ে পৌঁছি। এখানে ভাড়া মিটিয়ে দেখি সামনে দাঁড়িয়ে আছে লাকী, সে রাজনীতি প্রাণ মানুষ; কবছর হলো এখন ইংল্যাণ্ড প্রবাসী। দেখা হয় রউফ, (আব্দুর রউফ, সে এখন জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক), ওয়াদুদ ও মালিকের সাথে। ওয়াদুদের বাড়ি- সাদিপুর, সে এখন পুরোই বিশিষ্ট মুরব্বি; তারুণ্যে মালিকের অধিকার মনে হয়- ত্রিশের। দুঃখিত যে, তাদের সাথে আমার মনে হলো এই প্রথম দেখা ও আলাপ, আমি কি না তাদের ভুলে গিয়েছিলাম! এর মধ্যে রিজিকের সাথে দেখা হলে আমরা কোলাকুলি করি; মনে পড়ে স্কুলে সে ছিল বেশ নাটুকে, একটু সামনে দুলে হাঁটতো, এখন তার ছিপছিপের কিছু অবশিষ্ট নেই। তখন কবিতাটবিতার কথাও সে ভেবে থাকতে পারে। ভাবি- কতদিন পর আমাদের এই সাক্ষাৎ! এই রিজিকও এখন ইংল্যাণ্ড থাকে। এখানে দুলা ও মুকিম তো ছিলই। পেছন দিকে দেখি- অফিস থেকে বের হয়ে আসছেন মশিউর স্যার এবং অশেষকে স্যারও। দুজনই বলেন কলেজের অফিসে গিয়ে বসতে, আমরা যাই এবং প্রথমবারের মতো দেখি বর্তমান অধ্যক্ষ মহোদয় প্রফেসর শহীদুল আলম স্যারকে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আরও ক'জন শিক্ষক, কুশলাদির পর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্যারের সাথে আমাদের আলাপ হয়। একসময় পেছন থেকে শুনতে পাই, কেউ একজন বলছেন, আমি নাকি সাহসী মানুষ। এটা অশেষ স্যারের কাজ, না নিশি স্যারের- বুঝতে পারি না। ওয়াদুদও মনে হয় তখন তাঁর সায়টা জানাতে ভুলেনি। বাস্তবে আমি জানি আমার ভীতির পরিসর, একে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে পারি না, শুনতে হয় তার কথা! এছাড়া এটা উঠতি যৌবনের কথা নয়, যে মানুষ কি না এর মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে তার জীবনের অর্ধশতক, তাকে এটা মনে রাখতেই হয়।


বলা বাহুল্য আমার জন্য আলাপের এই মুহূর্তটা ছিল বেশ উপভোগ্য ও শেখার। এখানকার অধ্যক্ষ স্যার জানালেন, আমাদের কলেজ- শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ে বেশ আগে তিনি এসেছিলেন। যদিও বলতে গেলে সেটা ছিল আমাদের কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়। কিন্তু স্যারের স্মৃতি ও উপস্থিতির কথা স্মরণ না করতে পেরে লজ্জাই অনুভব করেছিলাম। কিন্তু এখানে স্যার 'বেশ আগের কথা, বয়সও তখন কম ছিল, এখন দাড়িও রেখেছেন' বলে পরিবেশটাকে সহজ করে দিয়েছিলেন। জেনেছি- স্যার কলকলিয়া ইউনিয়নের মানুষ এবং তাঁর গ্রামের নাম- শ্রীধরপাশা। সেটা আমাদের শাহজালাল মহাবিদ্যালয় থেকে তত দূরের নয়। তা-ই স্যারকে আবারও একদিন আমাদের এখানে আসার নিমন্ত্রণ করি। একই সাথে আমরা আলাপের ফাঁকে অপেক্ষা করতে থাকি কখন ডাক আসে আয়োজকদের এবং মোড়ক উন্মোচনের। এর মধ্যে তাদের প্রস্তুতি শেষ হয়ে গেলে আমরা দেরি করি না, পুরাতন ভবনের পেছনের দিকে হাঁটতে থাকি এবং এখানে যে ভবনটা আছে, হল রুমটা হলো এর তৃতীয় তলায়- গিয়ে উপস্থিত হই। যদিও এখানে আমার সে-ই আলাপ ও আড্ডার দাবি আর থাকেনি, পরিসরটা দাঁড়িয়েছে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে; তাই উপস্থাপকেরা সে মতোই এটা এগিয়ে নিলেন। সভাপতির আসন গ্রহণ করে লাকী, অধ্যক্ষ শহীদুল স্যার হলেন প্রধান অতিথি; এখানে আমরা ক'জন- মশিউর স্যার, রউফ ও রিজিক হলাম বিশেষ অতিথি। কবির ও (কবির উদ্দিন, বাড়ি- হবিবপুর, তাকে নিয়ে বললে অনেক কিছু বলা যায়। সে জানি- বাজারেই বড় হয়। সে কারণে অন্য অনেকের তুলনায় তার সাথেই বেশি দেখা-সাক্ষাৎ হতো আমার। এসব কত পুরনো কথা ও অভিমানে ভরা ছিল- মিন্টু ছাড়া আর জানে ক"জন!) দুলা পুরো অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করে। এবার মোড়ক উন্মোচনের পর শুরু হয় আলোচনা- আমাদের স্মৃতির সে পুনরুদ্ধার ও পুনরাবৃত্তি এবং সেটা উসকে দেওয়ার কাজ।


এখানে কিছুটা বলতে হয় আমাকেও। আগেই বলেছি এখানকার অনেকে ছিলাম আমরা স্বরূপ চন্দ্র থেকে আসা- এই কলেজের ছাত্র। তা-ই বন্ধুতা ও সুহৃদ হিসেবে আমাদের গল্পটা ছিল তখন পুরনো। আমরা যে এই একই কলেজের ছাত্র ছিলাম এবং এর জন্ম ও বিকাশ দেখেছিলাম এক সাথে- এটাও নতুন সংবাদ নয়। আমাদের এই কলেজ ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, এর প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন এডভোকেট শায়েক আহমদ। এই যাত্রালগ্নে এর ক্যাম্পাসটা ছিল স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে, যে রুমটা ছিল আমাদের ৬ষ্ট শ্রেণি, এর মধ্যে পার্টিশন দিয়ে ক্লাস শুরু হয়েছিল একাদশের। সে বছর প্রেসিডেন্ট এরশাদ দ্বিতীয়বারের মতো এসেছিলেন জগন্নাথপুর, মঞ্চ তৈরি হয়েছিল কিন্তু এখনকার এই প্রস্তাবিত কলেজ প্রাঙ্গনে। তখন এখানে কিছুই ছিল না। এরকম একটা অনুষ্ঠান মঞ্চের জন্য অনেক সংস্কার করে নেওয়া হয়েছিল। সেদিন রোদও ছিল অনেক। এখান থেকে আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠ স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের জাতীয়করণের ঘোষণা আসে এবং এর নামের সাথে যুক্ত হয় আরও একটি শব্দ- 'সরকারি।' প্রেসিডেন্ট মনে হয় তখন জগন্নাথপুর কলেজের জন্য মঞ্জুর করেছিলেন ১০ লক্ষ টাকা। এখন কলেজের পুরান যে ভবন, এর একটু সামনে নির্মাণ করা হয়েছিল ভিত্তি প্রস্তর ফলক। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ছিলেন তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রী, উদ্বোধন করেছিলেন এর নির্মাণ কাজের। বলি- কেবল সিলেটের শাহজালাল বিশ্বিবদ্যালয় নয়, তখন মফস্বলে অবস্থিত আমাদের এই জগন্নাথপুর কলেজও তাঁর যত্নশীল ভূমিকায় গড়ে উঠেছিল। এখানে বলতে হবে এটাও ছিল তাঁর আরেক কীর্তি। মনে পড়ছে বাচ্চু ভাইয়ের কথা, তিনি ছিলেন সাহসের বরপুত্র। তাঁকে মনে হয় বেতাউকার বাচ্চু'র বাইরে কালা শফিকও বলা হতো, তাঁর ভালো নাম ছিল- শফিকুল হক চৌধুরী। প্রেসিডেন্ট এরশাদ তাঁকে তখন ছেলে বলে উল্লেখ করেছিলেন, চাপড়ে দিয়েছিলেন তাঁর পিঠ। ক'জন জানি-  বীর এই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন জগৎজ্যোতি দাসের সাথে 'দাস পার্টির সদস্য' এবং এর দ্বিতীয় কর্ণদার! যাক, আমরা এখনও কলেজে যে পুকুর দেখি, এর জায়গার পরিমাণ শুনে এসেছি ২২ কেদার; এটা ছিল আমার দেখা একমাত্র পদ্মপুকুর। এখানে পদ্মপাতা ও ফুল এমন ছিল যে, মনে হয় কেউ এর উপর দিয়ে হেঁটে সহজে অতিক্রম করতে পারবে। বিভিন্ন মিথ ও গল্পে আমার কাছে সে পুকুর- পদ্মপুকুর ছিল ভীতিকর। যদিও যখন এখানে ভর্তি হলাম, বার্ষিক ক্রীড়াতে সাঁতার কাটার কথা এখনও ভুলে যাইনি। মনে পড়ে আমি একবার মাঝখানে গিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে সরে গিয়েছিলাম। উপুর হয়ে দাঁড় বেয়ে তীরে ফিরে এসেছিলাম। এর পরের বছরের স্মৃতি ছিল আরও ভয়ংকর। প্রতিযোগীর নাম এখন মনে নেই, তীরে এসে হয়ে পড়েছিল বিষণ অসুস্থ। মনে পড়ে এসব মুহূর্তে আমি দৌড়ে লাইফবয় সাবান পেয়েছিলাম। কলেজে তখন ভবন ছিল একটা, এর মধ্যে একজন তাঁর পিতার নামে আরেকটা বানিয়ে দিয়েছিলেন। এটা বেশি বড় না হলেও আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো হতো এখানে। এই ভবনে আমার বলার মতো স্মৃতি আছে দুটি, এক- মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে একদিন বক্তব্য দিয়েছিলাম, দুই- জীবনানন্দ থেকে আবৃত্তি করে পেয়েছিলাম ১ম পুরস্কার কাপ-প্লেইট। তখন আমাদের বাইরে দাঁড়ানোর জায়গা বেশি ছিল না। পুরাতন ভবনের পশ্চিমে ছিল বেশ কলাগাছ, এখানে মনে হয় আমরা কিছু ছায়া পেতাম; এছাড়া তেঁতুলগাছের দিকে আমরা খুব একটা যেতাম না। কেশবপুর বাজারে তখন আমাদের বসা ও চা খাওয়ার মতো দু-তলা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও শানুর মিয়ার দোকান তো ছিলই। আমরা তাঁকে মামা ডাকতাম। তাঁর এই দোকান ছিল এই বাজারের প্রথম দোকান। সে হিসেবে অনেকদিন তাঁর নামে এই বাজারের নাম ছিল শানুরগঞ্জ। পরবর্তীতে লোকেরা নয়া বাজার নামকরণ করেছিলেন। উল্লেখ যে, এই শানুর মামা ছিলেন আমাদের কলেজের নাইটগার্ড। বজলু এখন বেঁচে নেই, কাজল থাকে ইংল্যাণ্ডে; দীপকের না হোক- নজমুলের মনে থাকার কথা যে, শানুর মামার কাছে আমরা কতটা ঋণী হয়ে উঠেছিলাম। সাহিত্যে অবশ্য একজনকে আমরা পেয়েছিলাম, তার কথা হয়তো এখন কারও মনে থাকার কথা নয়। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে নিয়ে আমাকে একটা দৈনিকে লিখতে হয়েছিল বড় এক গদ্য। এটা পরে পুনঃমুদ্রিতও হয়েছিল। এটা ছিল তার মৃত্যুতে এক বন্ধুর স্মরণ। মনে পড়ে সে-ই তৈয়ব আলী'র সমর্থনের জোরে আমরা একটা দেয়াল পত্রিকার বোর্ড বানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। এর শুরুর কয়েকটি সংখ্যা বের হয়েছিল আমার সম্পাদনা- হাতে লেখা ও অলংকরণে। একুশে ফেব্রুয়ারির একটা সংখ্যা ছিল মনে হয় আমাদের থেকে এই পত্রিকা প্রকাশের শেষ কাজ। এটা আমাদের ৯৩-৯৪ ব্যাচের বন্ধু ও সুহৃদ কতটা কী মনে রেখেছে এখন বলতে পারবো না। তবে এখানে এটাও বলে রাখি, এসবের একমাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দানকারী ছিলেন জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব- আমাদের বাংলার স্যার। তিনি পরবর্তীতে অবশ্য এই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পালন করে অবসরে গিয়েছেন। আমাদের কলেজে তখন দুটি শাখা ছিল- মানবিক ও বাণিজ্য। শিক্ষকবৃন্দের সংখ্যা ছিল স্বভাবত বিষয় ঘনিষ্ঠ। আপাত তাঁদের কথা আর বলছি না। তবে এটা তো বলতেই হবে যে, তাঁরা প্রত্যেকে ছিলেন জীবনশিল্পী এবং আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে জীবনকে অনুভব করতে হয়। এখানে তাঁদের প্রতি সালাম জানাই।


এতক্ষণ যা বললাম, এসব হয়তো উন্মোচিত এই তিরানব্বই-চুরানব্বই ব্যাচ ও তাদের 'স্মৃতির পাতায়' লেখা নেই; তবে এর পেছনের একটা গল্প বা স্মৃতির প্রত্নপাঠ বললে মনে হয় কারও দ্বি-মত হবার কথা নয়। সন্দেহ নেই এই উদ্যোগ ও পুনরাবৃত্তির বড় তাৎপর্য এখানে এবং তারা কি না সে কাজটা করে দেখিয়েছে। স্বভাবত এখানে সাধুবাদ তাদের প্রাপ্য। সাহিত্য অবশ্যই জীবনকে অনুভব করতে শেখায়, সে কারণে এর স্রষ্টা বা শিল্পীকে ধরন বিশেষে আমরা বলতে শুনি জীবনশিল্পী। এটা ভুল নয়। সঙ্গত কারণে এর বাইরে জীবনের সত্যকে জানতে আমাদের হাতে বিকল্প সুযোগ আছে কম। সাহিত্য সে দরোজা খুলে দেয়, আমরা দেখতে পাই সৌন্দর্য কী জিনিস। এভাবে তার সে রূপান্তরে উন্মোচিত সত্যকে জানারও সুযোগ সৃষ্টি হয়। তারুণ্যে আমরা মনে হয় তখন সে স্বর্গেই থাকি, শ্রুতি বা পাঠে সেটা আস্বাদন করতে অসুবিধা হয় না। সমস্যা হলো আমরা যখন বড় হই, বেড়ে যায় বয়স, তখন সে-ই সৌন্দর্য ও সত্য হয়ে উঠে দূরের। কিন্তু এই সময়েও এসে তিরানব্বই-চুরানব্বইয়ের বন্ধু ও সুহৃদেরা সেটা ভালোই মনে রেখেছে বলতে হবে। আমরা দেখবো প্রায় ৩যুগ পরে হলেও তারা নিজেদের এই সাহিত্যিক প্লাটফর্ম নিয়ে এসেছে, এখানে প্রকাশ করেছে 'স্মৃতির পাতায়' এবং  আমরা উন্মোচন করছি এর মোড়ক- এটা কম বড় ঘটনা নয়। এটাও আমরা ভুলে যাইনি এবং বলছি না যে, তারা কেউ লিটলম্যাগ কর্মী, এখানকার বড় কোনও সাহিত্যিক, কবি বা গল্পকার ও উপন্যাসিক বা প্রবন্ধকার। তবুও তারা যে একটা প্রয়াস বা চেষ্টাতে গিয়েছে- এর একটা সমাদর আমরা করতে পারি। এখানে ৯৩-৯৪ একটা সংখ্যা নয়, অতীতের রূপান্তর হিসেবেও বলা যায় না এসব কেবল একটা অতীতের সঞ্চয়; জীবন্ত মানুষ যে উদ্যোগ নেয়, কাটায়- সক্রিয় জীবন, উসকে দেওয়া স্মৃতিতে পাঠ করে আগামীর প্রত্যাশা ও নির্মাণ- মানতে হবে এটাও সম্ভাবনাপূর্ণ এই মানুষ ও তাঁদের ইতিহাসের দায়। বন্ধুরা সব এসেছিল, সুহৃদেরা সব বলেছিল এখানে আমরাও ছিলাম- এর মহত্ত্ব এখানে। তাই সাহিত্যের সে মর্মবস্তু বা শিল্পমূল্যের বিচার এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বলতে গেলে বন্ধুতা ও সুহৃদ সম্মিলন ছিল এর সবটা। সেদিক থেকে যদি বলি, তাহলে এটা ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের একটা পাঠ এবং এই 'স্মৃতির পাতায়' মুদ্রিত হয়েছে তাদের সে সময়ের ভাষা। মানুষ তো সময়ের একটা খোলসই, এখানে আমরা একসাথে পাঠ করছি সে-ই ব্যক্তি পর্যায়ের অতীতের রূপান্তর ও তাদের বর্তমানকে।


আপাত এর বাইরে আর কী বলা যায়? একসময় আমাদের এই কলেজ ছিল কেবল জগন্নাথপুর কলেজ। আগেই বলেছি এর বৃত্তান্তের কিছুটা এবং এখানে একাদশ পর্যন্ত ছিল এর বিস্তৃতি। একটা দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে এখানে খোলা হয় ডিগ্রি এবং ২০১৮ তে সেটা হয়ে যায় সরকারিও। সে নিরিখে জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এখন সেটা জগন্নাথপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ বটে। এখানে সম্পাদক বিশেষ কাউকে আমরা দেখতে পাই না, আছে- দশ জনের এক সম্পাদনা পরিষদ। এটা দীর্ঘকায় হলেও এখানে প্রচ্ছদে ডিগ্রি শব্দটা কীভাবে যেনো মিসিং হয়ে যায়। ভিন্ন মত তো সবকিছুতে থাকে, গণতান্ত্রিক সমাজের এ বড় সৌন্দর্য। একটা স্বাস্থ্যপূর্ণ সমাজেও আমরা দেখি এর উপস্থিতি- সেটা সহিষ্ণুতাপূর্ণ। এখানে প্রচ্ছদে আমাদের প্রথম একাডেমিক ভবন তথা পুরাতন ভবনের ছবিটা থাকতে পারতো, সেটা হতো সে সময়ের এক প্রতিফলন। সেটা হয়নি। তবুও এখানে যা হলো, বাক্য সমবায়ে লেখা হলো এর ব্যক্তি পর্যায়ের বয়ান- সব ঠিকই আছে। বলতে হবে এখানকার সূচিবদ্ধ প্রত্যেকে সব বড় লেখক। তাঁরা যতটা সম্ভব ধরতে চেষ্টা করছেন তাদের অতীতকে, ভাষায় নিয়ে এসে সেটা পরিবেশন করছেন। তাদের কাউকে চিনি, কাউকে চিনি না; হতে পারে এটা তাদের প্রথম কোনও লেখা, এখানে তারা এই 'স্মৃতির পাতায়' একটা নামই কেবল নয়। এর বাইরেও যাদের নাম এখানে এসেছে, অংশের থেকে সামান্যে উত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের সবাইকে সফল বলা যায়। আমার জন্য এর এই অংশীজন হতে পারা তাই কম আনন্দ ও গৌরবের নয়। 


কথা আর বাড়াবো না। এবার আলোচনা শেষ হলে শুরু হয় আমাদের দুই পর্বের আপ্যায়ন। আমরা এখানে প্রথম পেলাম দুটি করে মিষ্টি ও সিঙারা। রউফ মিষ্টি খাবে কি না জানতে চাইলে তাকে বলি, এখন কোনও দ্বিধা থাকা উচিত নয় এবং একটা তো খাওয়াই যায়। তারপর নিচে নেমে এসে আমরা ছবি তুললাম। অধ্যক্ষ স্যারের থেকে বিদায় নিয়েও আবার আটকে গেলাম দুলা'দের কাছে, এবার তাদের সাথে নাকি আমাকে যেতে হবে ছিক্কাতে। কী আর করা! গেলাম এবং স্বপ্ন-চূড়াতে গিয়ে আমরা খেলাম হাঁসভাত। তারপর লাকী ও অন্যান্যের থেকে বিদায় নিয়ে আমি ও মালিক সাড়ে চারটায় ধরি বাড়ি ফেরার পথ। ওয়াদুদ আগেই আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিল, এবার ছিক্কা থেকে যখন পৌরচত্বরে এলাম, বাজারের দিকে তখন চলে গেল মালিকও। বাসে বেশ কিছুক্ষণ একা বসে থাকতে হয়েছিল আমাকে, তখন চোখে এসে গিয়েছিল তন্দ্রাও; মনে পড়লো আমার পেছনে এখন পড়ে আছে স্মৃতিসঞ্চয়ের এই দিন। ভাবি- যেদিন যায়, আর ফিরে আসে! বলি- বন্ধু ও সুহৃদেরা তোমরা সব ভালো থেকো।

লেখক- শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

এ রহমান

মন্তব্য করুন: