‘কিওর ভোট আর কিওর কিতা’
সিলেট ল কলেজের দেয়াল ঘেঁষে, আবুল মাল ক্রিড়া কমপ্লেক্স যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছু চায়ের দোকান। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং নিয়মিত মানুষের ভিড়ে ভরা হলো কমরেড’র চা। দোকানটির মালিক ত্বোহা—সুনামগঞ্জের ছেলে, একসময় বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এখন চায়ের দোকানই তার জীবন-জীবিকা।
দুপুর দুইটার পর থেকেই ভিড় জমে চায়ের দোকানে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথা হয়, হাসি-মজা হয়, আর মাঝে মাঝে উঠে আসে দেশ-রাজনীতির কথা। এই দুপুরে বেঞ্চে বসেছিলেন ষাটোর্ধ আফসান আলী, মেন্দিবাগের বাসিন্দা। ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায় অভিজ্ঞ তিনি, কিন্তু নির্বাচনের কথায় মন বেশ কেমন ভাসছে।
আমি পাশে গিয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গ টানতেই তিনি সরলভাবে বললেন,“কিওর ভোট আর কিওর কিতা।”
উদাসীনতা যেন চোখে চোখে ফুটে উঠল। আফসান আলী জানালেন, মাত্র ৮ দিন বাকি, কিন্তু তার মনে ভোটের কোনো উত্তেজনা নেই। তাঁর জীবনে এমন নির্বাচন প্রথম। পাশের আরেক কাস্টমার যোগ করলেন, “ইবার ভোট লোক দেখানো। জামায়াত ক্ষমতায় আসবে, নিশ্চিত।”
তরুণ ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন, “ড.ইউনুস সরকারের আমেরিকার প্রভাব—তাতে ডিজাইনে ভোট কম হলেও বাস্তবে জয় জামায়াতের।”
চায়ের দোকানের আলোচনায় দেখা গেল সাধারণ মানুষের দুই মানসিকতা। একদিকে আছে উদাসীনতা, উৎসবের আমেজের অনুপস্থিতি এবং ব্যানার-পোস্টারের অভাব, যা কিছু ভোটারের কাছে শান্তির ইঙ্গিত। অন্যদিকে অনেকে উদ্বিগ্ন—নির্বাচনের পরদিন কী হবে তা নিয়েই চিন্তিত।
সুনামগঞ্জের জামলগঞ্জের বাসিন্দা রাসেল আহমদ বললেন, “দেশে নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু বোঝার উপায় নেই। হাট-মাঠ, মহল্লা—কোথাও আলোচনা নেই। ভোটের আগ্রহ নেই।”
সিলেট নগরীর ১৯ নং ওয়ার্ডের আবদুল মুবিন বললেন, “সরকার প্রধান বলেছে দেশের সেরা নির্বাচন হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব চেষ্টা করছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য।”
কিন্তু বিশ্বনাথের অনন্ত দাস ভিন্ন মনোভাবের। তিনি বললেন, “আপনারা ভোটের দিন ভাবছেন, আমি ভাবছি পরদিন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বা না যাওয়া—উভয়েই সংখ্যালঘুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”
চায়ের কাপের ওপরে এই রাজনৈতিক গল্পে ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা—নির্বাচনের উত্তেজনা নেই, কিন্তু উদ্বেগ আছে। ভোটের মাঠে ক্লান্তিহীন প্রার্থীরা ঘুরছে, অথচ সাধারণ মানুষ তুচ্ছ মনে করছে নির্বাচনকে। কোকিলের কিচিরমিচিরের মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে এই ভাবনা—ভোট কি শুধুই কাগজে লেখা সংখ্যা, নাকি জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের ভয়ঙ্কর রূপ?
কমরেডের চায়ের দোকানে, কাঁপুনি-মাখা এই নির্বাচনী সময়টা যেন বয়ে চলে চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে। ‘কিওর ভোট আর কিওর কিতা’—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে শুধু চায়ের কাপের ভেতর।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: