সিলেটে কমরেড আব্দুর রউফ মুকুলের স্মরণসভা: শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদের ডাক
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রগতিশীল ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)–এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড আব্দুর রউফ মুকুলের স্মরণে আয়োজিত এক শোকসভায় বক্তারা এ আহ্বান জানান।
আজ শুক্রবার বিকেলে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির ৩ নম্বর বার লাইব্রেরি হলে ‘কমরেড আব্দুর রউফ মুকুল শোকসভা আয়োজক কমিটি, সিলেট’–এর উদ্যোগে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শোকসভা আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুমার চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে এবং কমিটির সদস্য অধ্যাপক মো. আবুল ফজলের সঞ্চালনায় সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ দত্ত।
সভায় বক্তারা বলেন, কমরেড আব্দুর রউফ মুকুলের বিদায় কোনো সাধারণ ব্যক্তির মৃত্যু নয়; বরং এটি শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এক অগ্নিযোদ্ধার সাময়িক প্রস্থান। তিনি ছিলেন এ দেশের আপোসহীন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে নিরলস শ্রেণিযুদ্ধের সৈনিক।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, আজ ইউক্রেন, ফিলিস্তিন, ইরান, লেবানন ও সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষ ও শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে। বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে চীন-রাশিয়ার দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নব্য ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্তবাদী বাংলাদেশকে স্ব স্ব পক্ষে টানতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো চক্রান্ত করছে। এই অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে কমরেড মুকুলের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
কমরেড মুকুলের সংগ্রামী জীবনের স্মৃতিচারণ করে বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে গুলিবিদ্ধ হয়ে দেহের নিম্নাংশ চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেলেও তিনি কখনো পরাজয় স্বীকার করেননি। দুটি ক্রাচকে ভর করে চলাফেরা করলেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনা ছিল অটল ও তেজস্বী। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন প্রকৃত বিপ্লবীর শক্তি তাঁর দেহে নয়, বরং আদর্শে থাকে।
দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থার সমালোচনা করে সভায় বলা হয়, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের নয়, এটি লুটেরা ধনিক শ্রেণির রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। যেখানে সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও দমনের শিকার হচ্ছে, সেখানে জনগণের রক্ত-ঘামে অর্জিত সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই শোষণমূলক ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে শ্রমিক-কৃষকের রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠাই ছিল আব্দুর রউফ মুকুলের আজীবনের লড়াই।
বক্তারা আরও বলেন, সংশোধনবাদ ও সুবিধাবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে কমরেড মুকুল সবসময় আপসহীন ছিলেন। আজ তাঁকে স্মরণ করার প্রকৃত অর্থ হলো তাঁর অসমাপ্ত বিপ্লবী দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া এবং কলকারখানা, গ্রাম ও শিক্ষাঙ্গনে শোষণ ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা।
সভার শুরুতে প্রয়াত এই নেতার স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন কমিটির সদস্য আব্দুস সালাম।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সুনামগঞ্জ জেলার সভাপতি রত্নাকুর দাস জহুর, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. ছাদেক মিয়া, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি সিলেটের সভাপতি সৈয়দ মনির হেলাল, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনির উদ্দিন, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন রশীদ সোয়েব, শওকত উসমান জুবের, শোকসভা কমিটির নেতা জিয়াউর রহমান সিপার, জাতীয় ছাত্রদল সিলেটের আহ্বায়ক শুভ আজাদ শান্ত, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি সিলেটের আহ্বায়ক মিনারা বেগম এবং বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সুজন মিয়া।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: