শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক ১৮ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে সরকার
Led Bottom Ad

মোট লোকসান ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক ১৮ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে সরকার

প্রথম ডেস্ক

২৫/০৫/২০২৬ ১৩:২৩:২৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজীবাজারে অবস্থিত ১০০ মেগাওয়াট ও ৩৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বৃহৎ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, উপর্যুপরি যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জেরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে রাষ্ট্র; বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ খাতের এই মেগা প্রকল্পে সরকারের মোট সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা বিপুল ব্যয়ে নির্মিত শাহজীবাজার ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালেই পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও নানা কারিগরি জটিলতায় তা আজও পুরোপুরি সচল করা যায়নি; উপরন্তু ২০২১ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের শুরুতেই মার্কিন প্রযুক্তির এই টারবাইনের অত্যন্ত মূল্যবান ব্লেড ভেঙে যাওয়ার পর কেন্দ্রটিতে বারবার রহস্যজনক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে থাকে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে পুনরায় টারবাইনের ব্লেড বিকল হয়ে যাওয়ার পর থেকে কেন্দ্রটির উৎপাদন কার্যক্রম আজ অবধি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, গত চার বছরে এই আধুনিক কেন্দ্রটি সব মিলিয়ে মাত্র ১ হাজার ৬১০ ঘণ্টা চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল, যা থেকে জাতীয় গ্রিডে মাত্র ৬৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে; অথচ মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারত, যার বর্তমান বাজারমূল্যে দৈনিক আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি টাকা এবং সেই হিসাবে সময়মতো চালু না হওয়ায় গত ছয় বছরে শুধু এই ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি থেকেই দেশ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সাশ্রয় থেকে সরাসরি বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় ২ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা বিশাল ব্যয়ে নির্মিত শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পরপরই একাধিক বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে এবং একপর্যায়ে ২০২২ সালের ২৯ মে কেন্দ্রটিতে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে এর প্রধান ট্রান্সফরমারটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়, যার ফলে কেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম একযোগে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক স্তরে জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন মেরামতকাজ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে এর কোনো সুফল মেলেনি এবং সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বৃহৎ কেন্দ্রটি বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় গত চার বছরে সম্ভাব্য প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার। শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানান, বিদ্যুৎ বিপর্যয় কাটাতে বর্তমানে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট কোনো রকমে চালু করা সম্ভব হয়েছে, যা থেকে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং এতে প্রতিদিন সরকারের প্রায় ৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে; তবে কেন্দ্রটির বাকি দুটি ইউনিটও যদি পুরোপুরি চালু করা যেত, তাহলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন আরও প্রায় ১৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব হতো। সব মিলিয়ে ৩৩০ মেগাওয়াট ও ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন স্থবিরতা ও কারিগরি ব্যর্থতার কারণে সরকারের সামগ্রিক ক্ষতি ও জাতীয় সাশ্রয় বঞ্চিত হওয়ার পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে দাবি করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক এ কে মফিজউদ্দিন আহমেদ কারিগরি দিক তুলে ধরে বলেন, ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য যে আন্তর্জাতিক মানের গ্যাস টারবাইন ব্যবহার করা হয়েছে তা অত্যন্ত আধুনিক; কিন্তু কেন এটি বারবার এমন মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হচ্ছে এবং ব্লেড ভেঙে যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা নিবিড়ভাবে তদন্ত করে দেখছেন। তিনি আরও জানান, এই মেগা প্রকল্পে ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের অগ্রগতি সাপেক্ষে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে; তবে চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পূর্ণ শেষ ও স্থায়ীভাবে সচল না হওয়ায় এখনো প্রায় ৯০ কোটি টাকার চূড়ান্ত বিল আটকে রেখেছে পিডিবি, যা শতভাগ সফল উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ার পর পরিশোধ করা হবে।


এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad