বিশ্বের দীর্ঘতম নেটওয়ার্কের পথে মিশর
কায়রোতে আফ্রিকার প্রথম চালকবিহীন মনোরেল চালু
মিশরের রাজধানী কায়রোর দীর্ঘদিনের যানজটের চিরচেনা ভোগান্তির অবসান ঘটাতে এবং ক্রমবর্ধমান নগরবাসীর ওপর চাপ কমাতে মরুভূমির বুকে নির্মিত নতুন প্রশাসনিক রাজধানীকে কেন্দ্র করে চালু হলো আফ্রিকার প্রথম সম্পূর্ণ চালকবিহীন সর্বাধুনিক মনোরেল নেটওয়ার্ক; যা আফ্রিকার পরিবহন খাতে এক অভাবনীয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার নতুন প্রত্যাশা জাগিয়েছে। গত ৬ মে (২০২৬) আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ‘কায়রো মনোরেল’-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পূর্ব নীল’ বা ইস্ট নাইল রুট এবং এর মধ্য দিয়ে আফ্রিকা মহাদেশের ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা চালকবিহীন মনোরেল ব্যবস্থার এক গৌরবময় নতুন যুগের সূচনা হলো। মিশরীয় সরকারের যোগাযোগ ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মহাপরিকল্পনার অধীনে নির্মাণাধীন এই মেগা প্রকল্পের দুটি রুট সম্পূর্ণভাবে চালু হয়ে গেলে এটি দৈর্ঘ্যের দিক থেকে এশিয়া ও ইউরোপকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম স্বীকৃত মনোরেল নেটওয়ার্কে পরিণত হবে। বর্তমানে সফলভাবে চালু হওয়া ৫৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট নাইল রুটটি মূলত কায়রো নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নাসর সিটির আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে সরাসরি নবনির্মিত অত্যাধুনিক নতুন প্রশাসনিক রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে; এর পাশাপাশি ৪৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পশ্চিম নীল’ বা ওয়েস্ট নাইল রুটের নির্মাণকাজও বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, যা উদ্বোধনের পর বিখ্যাত ৬ অক্টোবর সিটি থেকে গিজা শহর পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের হিসাব অনুযায়ী, এই দুটি রুট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে পুরো নেটওয়ার্কটির মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১০০ কিলোমিটারের বেশি, যা বর্তমানে পৃথিবীর দীর্ঘতম মনোরেল ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত চীনের চংকিং মনোরেলকেও (Chongqing Monorail) দৈর্ঘ্যের দিক থেকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যাবে এবং দুটি রুট পুরোপুরি সচল হলে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ যাত্রী অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবেন।
ঐতিহাসিক এই উদ্বোধনের পর সাধারণ মানুষকে আধুনিক এই গণপরিবহনের সাথে পরিচিত করতে প্রথম তিন দিন যাত্রীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মনোরেলে ভ্রমণের এক বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে চারটি নির্দিষ্ট জোনভিত্তিক ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করে বাণিজ্যিকভাবে টিকিট বিক্রি শুরু হয়, যার অধীনে পুরো ইস্ট নাইল রুটে একমুখী বা ওয়ান-ওয়ে যাত্রার জন্য সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ মিশরীয় পাউন্ড। কায়রো নগরীর বিদ্যমান তিনটি ঐতিহ্যবাহী আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো লাইন বর্তমানে বছরে প্রায় ৫০ কোটিরও বেশি বিশাল যাত্রী পরিবহন করে থাকে এবং নগরের এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার যাতায়াতের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে বিগত ২০১৯ সালে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ডের এক বিশাল মেগা চুক্তির মাধ্যমে এই যুগান্তকারী নতুন মনোরেল প্রকল্পটি হাতে নেয় মিশর সরকার। বিশ্বখ্যাত ফরাসি রেল নির্মাতা জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান ‘আলস্টম’ (Alstom)-এর সরাসরি নেতৃত্বে গঠিত একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটির নকশা, নির্মাণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার মূল দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করছে। ইংল্যান্ডের ডার্বির বিশ্বমানের কারখানায় নির্মিত অত্যাধুনিক ২৭২টি মনোরেল কোচ নিয়ে গঠিত মোট ৬৮টি ট্রেন এই রুটে নিয়মিত চলাচল করবে, যা প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার যাত্রী বহনের এক অনন্য সক্ষমতা রাখে এবং ট্রেনগুলো সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে বিরতিহীনভাবে ছুটবে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলস্টমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত এই মনোরেল ব্যবস্থা শতভাগ পরিবেশবান্ধব, এতে শব্দদূষণ প্রায় নেই বললেই চলে এবং এর বিশেষ ব্রেকিং প্রযুক্তির সময় উৎপন্ন শক্তির ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুদ্ধার বা রি-জেনারেট করা সম্ভব, যা ট্রেন পরিচালনার সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও খরচ বহুগুণ কমিয়ে দেয়। মিশর সরকার অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আশাবাদী যে, মরুভূমির বুকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা তাদের এই নতুন প্রশাসনিক রাজধানী ভবিষ্যতে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের এক আধুনিক আবাসস্থল হবে এবং সেখানে অন্তত ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে; আর সেই সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখেই দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এমন পরিবেশবান্ধব ও যুগোপযোগী আধুনিক গণপরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন-এর বিশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: