সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা দায়ের

ওসমান হাদি হত্যা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা দায়ের

প্রথম ডেস্ক

০৪/০৬/২০২৬ ১৯:১৬:০৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ছাত্র সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর কেন্দ্রীয় মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ও খুনিদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক চরম বিস্ফোরক ও আন্তর্জাতিক চাঞ্চল্যকর মন্তব্যের জেরে এবার তাঁর বিরুদ্ধে খোদ ভারতেই রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ একাধিক গুরুতর ও জামিন অযোগ্য ধারায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে; বাংলাদেশের একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি জড়িয়ে জনসমক্ষে দেওয়া মমতার এই বক্তব্য দুই দেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, ভারতের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরভাগের শিলিগুড়ি সাইবার ক্রাইম থানায় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও জামিন অযোগ্য ধারায় এই অপরাধমূলক অভিযোগটি দায়ের করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের প্রখ্যাত নারী আইনজীবী রিংকু চ্যাটার্জি সিং। মামলার এজাহারে অভিযোগকারীর মূল দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে নিজের ভরাডুবির পর চরম রাজনৈতিক হতাশায় ভুগে ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এবং দেশের সীমান্ত ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রকাশ্য জনসভায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন তুলে সাধারণ জনমনে তীব্র ঘৃণা ও বিভেদ তৈরির এক অপচেষ্টা করেছেন; এর চেয়েও বড় অপরাধ হলো, সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভারত সরকার ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি জড়িয়ে তাঁর দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য আন্তর্জাতিক স্তরে বিশ্বের বুকে ভারতের সম্মান চরমভাবে ক্ষুণ্ন ও ধূলিসাৎ করেছে, যা খুব দ্রুত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। এই বিপজ্জনক রাজনৈতিক মন্তব্য দুই দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাশাপাশি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি বলেও অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তীব্র রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ঘটনায় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভারতের নতুন ফৌজদারি আইন ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (বিএনএস)-এর ১৫২, ১৫৩, ১৫৩(এ), ১৯১, ১৯২, ১৯৬, ৩৫১, ৩৫২ এবং ৩৫৩-সহ একাধিক জামিন অযোগ্য ও কঠোর ধারায় এই এফআইআর বা অভিযোগটি নথিভুক্ত করা হয়েছে; যেখানে নবপ্রবর্তিত ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) এর ১৫২ ধারাটি মূলত দেশের পূর্ববর্তী ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ আইনের আধুনিক রূপ, যা ভারতের সার্বভৌমত্ব, একতা, অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে বিপন্নকারী বা ক্ষুণ্নকারী যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। এছাড়া দায়েরকৃত মামলার ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) ধারা ১৫৩ অনুযায়ী, ভারত সরকারের সাথে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিতে বসবাস করা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের (এক্ষেত্রে বাংলাদেশ) বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, যুদ্ধ করার অপচেষ্টা করা বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধে সহায়তা করা একটি রাষ্ট্রবিরোধী গুরুতর অপরাধ; এর পাশাপাশি মামলার বিএনএস ১৫৩ (এ) ধারা অনুযায়ী, দুই দেশের সাধারণ মানুষের ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা জন্মস্থানের স্পর্শকাতর ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র শত্রুতা বা সামাজিক বিদ্বেষ ছড়ানো এবং দুই বাংলার চিরন্তন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সম্পূর্ণ নষ্ট করার সুনির্দিষ্ট অপরাধে মমতাকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। শিলিগুড়ি থানায় অভিযোগ দায়েরের পর আইনজীবী রিংকু চ্যাটার্জি সিং সাংবাদিকদের কড়া ভাষায় বলেন, ‘একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হত্যাকাণ্ড ও আমাদের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জড়িয়ে এমন রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং অবিলম্বে মমতার এই বিপজ্জনক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে একটি উচ্চপর্যায়ের ও নিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় তদন্ত প্রয়োজন; আমি সিআইডি বা সিবিআই তদন্তের দাবি জানাচ্ছি এবং আগামী ৮ জুন (সোমবার) গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর উচ্চ আদালত বা কলকাতা হাইকোর্ট খুললেই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (Arrest Warrant) জারির দাবিতে হাইকোর্টে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করব।’

উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে বিপুল আসনের ব্যবধানে শোচনীয় পরাজয়ের দীর্ঘ প্রায় এক মাস পর গত মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় নিজের প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির মঞ্চ থেকেই বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যা প্রসঙ্গ টেনে এনে এক অভাবনীয় ও বিস্ফোরক দাবি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা দুই দেশের গণমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে প্রধান শিরোনামে রূপ নেয়। ওই বিশাল রাজনৈতিক জনসভা থেকে মমতা প্রকাশ্য মাইকে দাবি করেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা একটা বড় ও দুর্ধর্ষ খুনিকে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের বিশেষ শাখা এসটিএফ (STF) অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে গ্রেপ্তার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশে তখন অনেক বড় আন্দোলন ও তোলপাড় হয়। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ কথা আমি এই মঞ্চ থেকে বলছি না, কারণ অন্য দেশের বিষয়ে আমার অধিকারও নেই বলার; কিন্তু আমি যেটা আজ পরিষ্কার বলতে চাইছি তা হলো— ওই ওসমান হাদির হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অত্যন্ত গোপনে অবৈধভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে চলে আসে এবং বাংলায় আসার পর আমাদের দক্ষ এসটিএফ তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে, যা আমাদের রাজ্য পুলিশের এক বিশাল কৃতিত্ব। কিন্তু আসামিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে সরাসরি আমাকে ফোনে কল করেছিলেন এবং আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে— আপনি আপনার রাজ্য পুলিশকে কড়া নির্দেশ দিয়ে জানিয়ে দিন, এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি যেন কোনোভাবেই মিডিয়ার সামনে বাইরে না যায় বা প্রকাশ না পায়, কারণ এটা নাকি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ব্যাপার।’ এই গল্প ফাঁদার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি লক্ষ্য করে চরম আক্রমণাত্মক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে মমতা আরও বলেন, ‘আমি আজ অমিত শাহকে প্রশ্ন করতে চাই— কাকে দিয়ে আপনারা বাংলাদেশে ওই খুনটা করিয়েছিলেন? কার কার নাম সেই খুনের তদন্তে পুলিশি জেরায় বেরিয়ে এসেছিল? আজকের দিনে ওখানের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সব রহস্যের গোড়ার খবরটাই খুব ভালো করে জানি, কারণ আমার এই হৃদয়টাই হলো গোপন কথার একটা মস্ত ভাণ্ডার; এতদিন দেশের স্বার্থে আমি এসব কথা মুখ ফুটে বলিনি, কিন্তু আজকে আমাদের ওপর অত্যাচার ও কেন্দ্রীয় এজেন্সির জুলুম শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে বলেই আমাকে আজ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে হয়েছে; আমি সেই খুনের মূল চক্রান্তকারী বড় নামটা আজ এই মঞ্চ থেকে বলতে চাইছি না, কারণ সেই নামটা আজ বললে ওদিকের বাংলাদেশ পুরো উত্তাল ও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়ে যাবে; আমি ওপার বাংলাদেশকে মন থেকে ভালোবাসি, তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আজ ওই নাম আমি মুখে আনবো না।’


এ রহমান

মন্তব্য করুন: