মরণনেশার বিরুদ্ধে তারুণ্যের প্রাচীর: মাধবপুরে গ্রাম পাহারা দিচ্ছে যুবসমাজ

মরণনেশার বিরুদ্ধে তারুণ্যের প্রাচীর: মাধবপুরে গ্রাম পাহারা দিচ্ছে যুবসমাজ

রাজীব দেব রায় রাজু,মাধবপুর প্রতিনিধি

১২/০৬/২০২৬ ২১:১৪:২৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মাদকের মরণছোবল থেকে নিজের জন্মমাটিকে রক্ষা করতে, ক্ষয়িষ্ণু তরুণ প্রজন্মকে আলোর পথে ফেরাতে এবার এক অনন্য ও আপসহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল হবিগঞ্জের মাধবপুরের যুবসমাজ। কোনো রকম সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপেক্ষা না করে, কেবল দেশপ্রেম আর সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা মরণনেশার বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। প্রশাসনের পাশাপাশি নিজেদের গ্রামকে শতভাগ মাদকমুক্ত করার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বুক চিতিয়ে রাস্তায় নেমেছে এই অঞ্চলের অদম্য যুবকেরা।


গ্রামের প্রবেশমুখে তারা বসিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী ‘চেকপোস্ট’। অপরিচিত কাউকে দেখলেই চলছে বিনম্র কিন্তু তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসাবাদ। আর মাদক কিনতে এসে হাতেনাতে ধরা পড়লে সমাজদ্রোহীদের দেওয়া হচ্ছে কানধরে উঠবসের মতো প্রকাশ্য, লজ্জাজনক শাস্তি।


গত কয়েকদিন ধরে মাধবপুর উপজেলার আদাঐর ইউনিয়নের গোপালপুর ও হালুয়াপাড়া গ্রামে গেলেই চোখে পড়ছে এক অভূতপূর্ব ও অনুপ্রেরণাদায়ী দৃশ্য। যুবকদের এই ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগ পুরো এলাকায় এক পজিটিভ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোপালপুর ও হালুয়াপাড়া গ্রামে ইদানীং মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। বিষাক্ত হয়ে উঠছিল সামাজিক পরিবেশ, হুমকির মুখে পড়ছিল শত শত তরুণের ভবিষ্যৎ। কিন্তু তৃণমূলের এই যুবকেরা নিস্পৃহ দর্শকের মতো সমাজ ধ্বংসের এই খেলা চেয়ে চেয়ে দেখেনি। এই ভয়াল পরিস্থিতি রুখতে দুই গ্রামের সচেতন ও দেশপ্রেমিক যুবকরা এক সুতোয় ঐক্যবদ্ধ হয়ে দল গঠন করেছেন।


দিন হোক কিংবা রাত—তীব্র গরম কিংবা অন্ধকার উপেক্ষা করে পালাক্রমে গ্রামের প্রধান সড়ক ও গলির মুখে অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দিচ্ছেন তারা। বহিরাগত বা অপরিচিত কোনো ব্যক্তি গ্রামে প্রবেশ করলেই যুবকরা তাদের গতিরোধ করছেন। বিনম্র অথচ অনমনীয় দৃঢ়তায় জানতে চাওয়া হচ্ছে পরিচয় এবং গ্রামে আসার সুনির্দিষ্ট কারণ।


পাহারাকালীন সময়ে কোনো ব্যক্তি মাদক ক্রয় বা সেবন করতে এসেছে—এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা আলামত মিললে যুবকরা তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করছেন। সমাজকে কলুষিত করার চেষ্টার শাস্তি হিসেবে ক্ষেত্রবিশেষে মাদকসেবীদের কানধরে উঠবস করিয়ে এলাকা ছাড়া করা হচ্ছে, যাতে তারা পুনরায় এই পবিত্র মাটিতে পা রাখার সাহস না পায়।


তৃণমূল পর্যায় থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠা এই আন্দোলনের একজন উদ্যোক্তা ইশতিয়াক আহামেদ ইমন বুকভরা আবেগ ও প্রত্যয় নিয়ে বলেন:  "মাদক আমাদের সমাজটাকে, আমাদের ভাইদের জীবনটাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। পুলিশ-প্রশাসন তো তাদের কাজ করছেই, কিন্তু নাগরিক হিসেবে, এই মাটির সন্তান হিসেবে আমাদেরও তো একটা বড় দায়িত্ব আছে। আমরা ঘরে বসে আঙুল চুষতে পারি না। আমরা শপথ নিয়েছি, আমাদের এলাকাকে শতভাগ মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত এই পাহারা ও প্রতিরোধ লড়াই একচুলও থামবে না।"


অপর উদ্যোক্তা যুবক আতিকুর রহমান জুয়েল বলেন,আমাদের এই উদোগ গোটা সমাজকে নতুন পথের সন্ধান দিবে। তিনি জানান, এমন সাহসী ও স্বতঃস্ফূর্ত পদক্ষেপে দীর্ঘদিন পর স্বস্তি আর শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন গোপালপুর ও হালুয়াপাড়া গ্রামের সাধারণ মানুষ। ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকা মায়েরা এখন তাদের সন্তানদের নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন।


স্থানীয় মুরুব্বিরা আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, যুবকদের এই পাহারার কারণে গত কয়েকদিনে এলাকায় অপরিচিত ও সন্দেহভাজন লোকজনের আনাগোনা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। তরুণেরা প্রমাণ করে দিয়েছে, সদিচ্ছা থাকলে সমাজ বদলে দেওয়া সম্ভব। তবে এই মহৎ আন্দোলনকে আরও সুসংহত করতে এবং কোনো আইনি জটিলতা এড়াতে, বড় কোনো অপরাধী বা মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করলে সরাসরি পুলিশে সোপর্দ করার পরম স্নেহে পরামর্শ দিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল।


মাধবপুরের এই তরুণরা আজ শুধু দুটি গ্রামের রক্ষক নয়, তারা পুরো দেশের যুবসমাজের জন্য এক অনন্য বাতিঘর। তৃণমূলের এই জাগরণ ছড়িয়ে পড়ুক টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়—আজকের দিনে এটাই হোক প্রতিটি যুবকের অঙ্গীকার।

তানজুমা তাবাসসবুম / তাহির আহমদ

মন্তব্য করুন: