এবার লড়ছেন দেশসেরার প্রতিযোগিতায়
সিলেট বিভাগের সেরা শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক পূর্ণা রায় ভৌমিক
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ এর আওতায় সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন মৌলভীবাজারের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পূর্ণা রায় ভৌমিক। বর্তমানে তিনি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় সিলেট বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর এই সাফল্যে মৌলভীবাজারসহ পুরো সিলেট বিভাগের শিক্ষা অঙ্গনে আনন্দের আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
পূর্ণা রায় ভৌমিক বর্তমানে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দান ক্লাস্টারের আলী আমজদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে তিনি শিক্ষক সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, আধুনিক উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এর আগেও ২০১৯ সালে তিনি একইভাবে সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন।
এমএসএস, সি-ইন-এড এবং বি.এড ডিগ্রিধারী পূর্ণা রায় ভৌমিকের শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা প্রায় ৩৩ বছরের। তিনি ১৯৯৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ত্রৈলোক্যবিজয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি নওয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে টানা ১৬ বছর টিলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাল ধরেন। এরপর ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি বর্তমান আলী আমজদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।
পূর্ণা রায় ভৌমিক প্রায় ২৫ বছর ধরে ইংরেজি বিষয়ের প্রশিক্ষক (ট্রেইনার) হিসেবে কাজ করছেন। 'ইংলিশ ইন অ্যাকশন' কর্মসূচির এইচটিএফ (HTF) হিসেবে তিনি ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালে তিনি 'ট্রেনিং অব মাস্টার ট্রেইনার ইন ইংলিশ' (TMTE) সম্পন্ন করেন। পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উচ্চতর প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের অধীনে একটি বিশেষ অনলাইন প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং ওপেন (OPEN) কমিউনিটি অব প্র্যাকটিস প্ল্যাটফর্মে নেতৃত্বমূলক কার্যক্রমের স্বীকৃতি অন্যতম।
বিদ্যালয়কে আনন্দময় করে তুলতে তিনি প্রায় ২৪টি উদ্ভাবনী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন। এর মধ্যে তাঁর তৈরি 'উচ্চারণ (বাংলা অডিও)' এবং 'গেটপাস' প্রকল্প দুটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর চালু করা— ‘স্মাইলি’, ‘স্টার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ কর্নার’, ‘ঝুলন্ত বিন’, ‘বোতল দিয়ে জুতা রাখার র্যাক’, ‘পোর্টফোলিও’, ‘ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব’, ‘মজার দোকান’, ‘প্রয়োজন ব্যাংক’, ‘সেরা শিক্ষার্থী বোর্ড’, ‘স্বপ্নবৃক্ষ’, ‘সাফল্যবৃক্ষ’ ও ‘পজিটিভ বোর্ড’ শিক্ষা মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন পূর্ণা রায় ভৌমিক। ২০১৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় তাঁর 'প্রৈতি' নামক একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও রম্যরচনা লেখার পাশাপাশি গান, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন ও কারুকলার প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী। তাঁর স্বামী রানু কুমার তালুকদার একজন কলেজ শিক্ষক। পূর্ণা রায়ের মতে, স্বামীর অকুণ্ঠ সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণাই তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম প্রধান শক্তি।
বিভাগীয় শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় পূর্ণা রায় ভৌমিক বলেন: "শিশুদের নিয়ে কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। যতদিন বেঁচে থাকব, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই। এই সম্মাননা আমাকে আগামীতে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেবে।”
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে পূর্ণা রায় ভৌমিকের দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও আপসহীন নেতৃত্বের যোগ্য স্বীকৃতিই হচ্ছে এই পদক। জাতীয় পর্যায়েও তিনি শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব অর্জন করবেন বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শাহিন আহমেদ/ ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: