একই এলাকায় ২ মাসে ৯ মরদেহ উদ্ধার,আতঙ্কে নারীরা

একই এলাকায় ২ মাসে ৯ মরদেহ উদ্ধার,আতঙ্কে নারীরা

প্রথম ডেস্ক

১৯/০৯/২০২৬ ১১:৩২:৫৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহত্তম শহর জোহানেসবার্গের পূর্বাঞ্চলে একের পর এক নারীর মরদেহ উদ্ধারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একই এলাকায় উদ্ধার হয়েছে নবম নারীর মরদেহ।

 গত বৃহস্পতিবার সকালে ডন পার্ক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরেক নারীর মরদেহ। পরপর এমন ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও ভয়।

সিএনএন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই, এই নয়টি মৃত্যুর মধ্যে কি কোনো অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে? কিছু ঘটনার মধ্যে মিল খুঁজে পেলেও তদন্তকারীরা এখনো নিশ্চিত নন, এগুলো একই সূত্রে বাঁধা কি না। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সামনে আসছে আরো ভয়ংকর আশঙ্কা—এর পেছনে কি কোনো সিরিয়াল কিলার রয়েছে? কিন্তু উত্তর না মেলা সেই প্রশ্নই এখন জোহানেসবার্গের পূর্বাঞ্চলে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলছে।

সেই আতঙ্ক যেন এখন আর শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে পুরো একুরহুলেনিজুড়ে।

সহিংসতা ও নারীহত্যার বিরুদ্ধে কাজ করা দক্ষিণ আফ্রিকার অলাভজনক সংস্থা ‘উইমেন ফর চেঞ্জ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাবরিনা ওয়াল্টার সিএনএনকে বলেন, ‘নারীরা আতঙ্কিত। নিরাপদে বেঁচে থাকার জন্য এখানকার নারীরা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের জীবনযাপনের ধরন বদলে নিতে বাধ্য হয়েছেন।’

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেছেন, ‘এসব হত্যাকাণ্ড বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

 তিনি পুলিশকে মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন। এরই মধ্যে এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডগুলো কি পরস্পর সম্পর্কিত?

দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীদের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশকে গাউটেং প্রদেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হন মোজেস সিথোল। ওই ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন নারী ও এক শিশু নিহত হয়েছিলেন।

তাদের মধ্যে ১৫ নারীর দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয় জোহানেসবার্গের পূর্বে ক্লিভল্যান্ড এলাকা থেকে।

সেই ইতিহাসের পর এবার একুরহুলেনিতে একের পর এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তবে বর্তমান হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্ত চলার মধ্যেই কেম্পটন পার্ক ও আশপাশের এলাকার নারীদের সতর্ক করেছে পুলিশ। নির্জন এলাকায় একা হাঁটা বা দৌড়ানো এড়িয়ে চলতে এবং সম্ভব হলে দলবদ্ধভাবে বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কেম্পটন পার্কেই এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।

পুলিশ বলছে, তদন্ত চলাকালে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক নারী এতে হতাশ। তাদের বক্তব্য, নিরাপদ থাকার জন্য তারা এমনিতেই নিজেদের জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন এনেছেন।

নারী নির্যাতনবিরোধী সংগঠন ‘উইমেন ফর চেঞ্জ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাবরিনা ওয়াল্টার বলেন, ‘নারীরা সতর্ক থাকার কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত। আমরা ইতিমধ্যেই সতর্ক আছি।’ এমনই একজন লেবোগাং কেজিয়ারি। পেশায় অর্থ ব্যবস্থাপক এই নারী সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর নিজের দৈনন্দিন রুটিনও বদলে ফেলেছেন।

নিহত নারীদের একজন ছিলেন ৩৮ বছর বয়সী এলিজাবেথ সোনসো মোসেলাকগোমো। চলতি মাসের শুরুতে দৌড়াতে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি। কয়েকদিন পর উদ্ধার হয় তার মরদেহ। কেজিয়ারি মোসেলাকগোমোকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। তবে তাকে চিনতেন এমন কয়েকজন দৌড়বিদকে তিনি চেনেন। 

সিএনএনকে কেজিয়ারি বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের কারণে স্বাভাবিকভাবে দৌড়াতে বের হতে তিনি নিরাপত্তাহীন, উদ্বিগ্ন এবং অত্যন্ত আতঙ্কিত বোধ করছেন। একসময়ের স্বস্তির দৌড় এখন তার কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিরাপত্তার জন্য এখন তিনি শুধু নিজের সুরক্ষিত আবাসিক এলাকার মধ্যেই দৌড়ান। কখনও কমিয়ে দেন দৌড়ের সময়ও। অন্যদের সঙ্গে দৌড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না, কারণ কাজের সময়সূচি এবং সন্তানকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্বও তাকে সামলাতে হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার একুরহুলেনিতে একের পর এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষক নাঈমা আব্রাহামস বলেন, এটি শুধু একুরহুলেনির সমস্যা নয়, পুরো দক্ষিণ আফ্রিয়াতেই নারীহত্যা একটি গুরুতর সমস্যা।

২০২৪ সালের এক জাতীয় গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০/২১ সালে দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ জন নারী নিহত হয়েছেন। নিহত নারীদের প্রায় ৬০ শতাংশই ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে খুন হয়েছেন। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে নারীহত্যার হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

আব্রাহামস বলেন, প্রতিটি নারীহত্যার ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা জরুরি। একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা হলে সেটিকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তদন্তকারী নিয়োগ করা উচিত। তিনি আরো বলেন, নিরাপত্তার জন্য নারীদের জীবনযাত্রা বদলানোর পরিবর্তে পুরুষদের সহিংস আচরণ পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া দরকার।

২০২৫ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও নারীহত্যাকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে। তবে গবেষক ও অধিকারকর্মীদের মতে, শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বাজেট এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এদিকে সাম্প্রতিক ঘটনায় সাধারণ নারীদের মধ্যেও ভয় বেড়েছে। দৌড়বিদ লেবোগাং কেজিয়ারি জানান, নিরাপত্তার কারণে অনেক দিন দৌড়াতে বের হওয়ার পরিকল্পনা করেও শেষ পর্যন্ত বাইরে যেতে পারেন না।

রত্না বাউরী/প্রসি-২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad