মেয়েদের বই কিনে দিতে ৪৭ বছরের মায়ের দৌড়
দৌড়ানোর কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ ছিল না, ছিল না একজোড়া সাধারণ রানিং শু-ও। কিন্তু আগস্টের এক সকালে মহারাষ্ট্রের বিড জেলার ৪৭ বছর বয়সী রমাবাই রাণবীর যখন ৩ কিলোমিটারের দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম লেখান, তখন তার মাথায় দৌড়বিদ হওয়ার কোনো ভাবনা ছিল না।
ছিল কেবল একটিই চিন্তা—জিতলে ৩ হাজার রুপির যে পুরস্কার পাওয়া যাবে, তা দিয়ে দুই মেয়ের পড়াশোনার বই কেনা যাবে।
পায়ের সস্তা চপ্পল দুটো বারবার পিছলে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত চপ্পল খুলে ছুড়ে ফেলে, পরনের শাড়িটা শক্ত করে গুটিয়ে নিয়ে খালি পায়েই দৌড় লাগালেন তিনি। ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের বিভাগে সবাইকে পেছনে ফেলে ফিনিশিং লাইন পার হলেন সবার আগে।
রমাবাইয়ের এই দৌড় এবং পুরস্কারের টাকা জেতার গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেয়নি। সামাজিক মাধ্যমজুড়ে ঝড় তোলে প্রশ্ন: একজন মাকে তার মেয়েদের বই কিনে দেওয়ার জন্য খালি পায়ে দৌড়ে নামতে হয়, এটা কি সমাজের গৌরব নাকি লজ্জা?
২০১২ সালে স্বামী হারানোর পর থেকে পরিবারটির একমাত্র ভরসা রমাবাই। ১৩ বছর বয়সে নিজেই নিজের স্কুলের পাঠ চুকিয়েছিলেন দারিদ্র্যের কারণে। অন্যের ক্ষেতে সয়াবিন আর ছোলা তোলা থেকে শুরু করে হলুদ সংগ্রহের কাজ—যেদিন যা কাজ পেয়েছেন, সেটাই করেছেন।
সংসার চালানোর পাশাপাশি দুটি মেয়েকে বড় করে তোলার এক অদম্য যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। রমাবাইয়ের দুই মেয়ে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন। বড় মেয়ে পূজা পুলিশে নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর ছোট মেয়ে আরতি প্রস্তুতি নিচ্ছেন সিভিল সার্ভিসের। ভারতের লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর মতো তারাও সরকারি চাকরির মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু সেই পথ সহজ নয়।
ছোট মেয়ে আরতি কয়েক দিন ধরে বইয়ের অভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, এমনকি মায়ের সাথে কথাও বলছিলেন না। রমাবাই বলছিলেন, আমি তাকে বই কেনার টাকা পাঠাতে পারছিলাম না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে এই দৌড়ে নামতেই হবে এবং জিততে হবে।
এই ঘটনাটি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেও প্রকাশ্যে এনে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান সুখাদেও থোরাত মন্তব্য করেন, একজন মাকে যদি সন্তানদের সাধারণ শিক্ষার খরচের জন্য এত কষ্ট করতে হয়, তবে তা প্রমাণ করে যে সরকারি শিক্ষাবান্ধব প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। সংবাদটি নজরে আসার পর ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত স্থানীয় প্রশাসনকে রমাবাইকে ৫০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তার নির্দেশ দেন। বর্তমানে রমাবাই সেই কোচিং সেন্টারে রান্নার কাজ শুরু করেছেন, যেখানে তাঁর বড় মেয়ে পুলিশের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সামাজিক বিতর্ক বা সরকারি নীতি যাই থাক না কেন, রমাবাইয়ের দৃষ্টি এখন কেবলই মেয়েদের সুদিনের দিকে। শান্ত স্বরে তিনি বলেন, আমি চাই না আমার মেয়েরা সেই কষ্টের মধ্য দিয়ে যাক যা আমি পার করেছি। আমি চাই না তারা কাদামাটি ঘেঁটে বা প্রখর রোদে পুড়ে পথ চলুক। আমি যা কষ্ট সহ্য করেছি, আমার মেয়েরা যেন অন্তত একটি সম্মানজনক জীবন পায়।
রত্না বাউরী/প্রসি-২৬
মন্তব্য করুন: