নেপথ্যে রাজনীতি ও প্রশাসন
সুনামগঞ্জে তিন নদীতে দিনে ৩ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য!
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি অংশ মিলেমিশে একাট্টা হয়ে নদীগুলো থেকে নির্বিচারে বালু ও পাথর লুটে নিচ্ছে। সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে পরিবেশ ধ্বংসকারী ড্রেজার ও শক্তিশালী শ্যালো মেশিন ব্যবহার করায় হুমকিতে পড়েছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, আশপাশের বসতি ও জীববৈচিত্র্য। পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ শাখার একটি ‘অতি গোপনীয়’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন এই তিন নদী থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা অবৈধভাবে চাঁদাবাজি ও বালু-পাথর বিক্রি থেকে তোলা হয়। যার একটি বড় অংশ চলে যায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশের অসাধু কর্মকর্তা এবং সুবিধাভোগী একটি মহলের পকেটে।
৩ কোটির টাকার ভাগবাটোয়ারা যেভাবে
পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর বালুমহাল থেকে প্রতিদিন সংগৃহীত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগবাটোয়ারা হয়। এর মধ্যে বড় একটি অংশ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে বিভিন্ন স্তরে বণ্টন করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পুরো অবৈধ সিন্ডিকেটের পেছনে লজিস্টিক ও রাজনৈতিক শেল্টার দিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যুবলীগ নেতা ও জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দকার মঞ্জুর হোসেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলকে একটি বিলাসবহুল ‘ল্যান্ড ক্রুজার’ গাড়ি উপহার দিয়েছেন। এছাড়া ব্যবসার আরেক নিয়ন্ত্রক হিসেবে নাম এসেছে স্থলবন্দর শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং বালিজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেনের। যিনি বিগত সরকারের সময়কার বিভিন্ন আলোচিত মামলা এবং জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান সিন্ডিকেটে অন্যতম অর্থদাতা হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলা ১৪৩২ সালের জন্য যাদুকাটা নদীর ১ ও ২ নম্বর বালুমহাল ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। গত মার্চ মাসে ইজারার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়নি। ইজারাদারদের করা রিট ও আইনি মারপ্যাঁচকে পুঁজি করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেদারসে বালু তুলে আসছে। এতে সরকার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুলের অনুসারী ও একাধিক মামলার আসামি মানিক মেম্বার ধোপাজান নদীতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন। সেখানে প্রতি ফুট বালুর জন্য ৫ টাকা এবং প্রতিটি নৌকা থেকে ২ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া চেলা নদীতে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের প্রভাব খাটিয়ে জিনান এন্টারপ্রাইজের মালিক শাহ রুবেল আহমেদ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন।
এদিকে নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের নিষ্ক্রিয়তা এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় এই সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও সিন্ডিকেটের হাতবদল ঘটেছে কেবল, লুটপাট থামেনি। এর ফলে নদীমাতৃক এই অঞ্চলের বারকি শ্রমিকরা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত বালিজুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন দাবি করেন, "আওয়ামী লীগের কেউ এখন বালু তোলার সঙ্গে জড়িত নয়। বর্তমান এমপিরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং নিজেদের লোক দিয়ে খাস কালেকশনের নামে লুটপাট চালাচ্ছেন।"
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন, "কেউ কেউ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আমার নাম ব্যবহার করে থাকতে পারে। তবে এসবের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।" অন্য সংসদ সদস্যরা এ বিষয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে রাজি হননি।
সার্বিক বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান প্রথম সিলেটকে জানান, "বালুমহালের ইজারা ও হাইকোর্টের আদেশের আইনি প্রক্রিয়াগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। ভূমি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট মহলের নির্দেশনা পেলেই এই অবৈধ দখল ও লুটপাট রোধে কঠোর এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।"
নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: