“আমি যাইগা রে…’
Led Bottom Ad

অমর বীরের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার অশ্রু

“আমি যাইগা রে…’

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১৬/১১/২০২৫ ১১:২৬:৩৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

অসম সাহস, অদম্য মনোবল ও দেশপ্রেমে ঋদ্ধ এক নাম—শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস। তাঁর ৫৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আজ রবিবার (১৬ নভেম্বর) সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাঙ্গণে যেন জমে উঠেছিল বেদনাভরা গর্বের আবহ। কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জানানো হয় গভীর শ্রদ্ধা।


শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তারা স্মরণ করেন এই কিংবদন্তী গেরিলা যোদ্ধার বীরত্ব, যাঁর নাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে অবিনাশী আগুনের মতো। তাঁরা বলেন—“জগৎজ্যোতির আত্মদান শুধু একজন যুবকের মৃত্যু নয়, এটি ছিল স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের জন্য সর্বোচ্চ উৎসর্গ।”


বক্তারা আরও জানান, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের চার শহীদ—তালেব, গিয়াস, জগৎজ্যোতি ও আসগর—এ দেশের স্বাধীনতার বুনিয়াদকে শক্ত করেছে নিজেদের রক্ত দিয়ে। তাঁদের মধ্যে জগৎজ্যোতি ছিলেন এক দুর্ধর্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গেরিলা কমান্ডার। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ‘দাস পার্টি’ তখনকার হাওরাঞ্চলের শত্রু-অভিমুখী প্রতিরোধের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। পাক হানাদার বাহিনী তাঁর নাম শুনলেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠত।


অনুষ্ঠানে লেখক ও গবেষক সুখেন্দু সেন, সহযোগী অধ্যাপক আবদুর রকিব তারেকসহ অনেকে বলেন—

“জগৎজ্যোতির বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের প্রতিটি তরুণকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তাঁর নাম জানলেই বোঝা যায়—দেশের প্রতি ভালোবাসা কখনো বয়স দেখে না।”


উপস্থিত ছিলেন সহকারী অধ্যাপক আহসান শহীদ আনসারী, লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খলিল রহমান, কোষাধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট মাহবুবুল হাছান শাহীন, অ্যাডভোকেট এ আর জুয়েল, সুরঞ্জিত গুপ্ত রঞ্জুসহ আরও অনেকে।


জগৎজ্যোতি: জন্ম থেকে যোদ্ধা হয়ে ওঠা

১৯৪৯ সালে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্ম নেওয়া জগৎজ্যোতি ছাত্রজীবনেই অন্যদের চেয়ে আলাদা। অন্যায়ের প্রতিবাদ, অন্যের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া—এই ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়নকালেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের তেজস্বী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।


একাত্তরের ডাক আসতেই তিনি পাড়ি জমান ভারতের মেঘালয়ের ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁর নেতৃত্বে জন্ম নেয় দুর্ধর্ষ গেরিলা দল ‘দাস পার্টি’। তাঁদের আধুনিক অস্ত্র, কৌশল ও প্রাণঘাতী আক্রমণ তখনকার উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনকে করে তুলেছিল মুক্তাঞ্চল।


‘দাস পার্টি’ একের পর এক অপারেশনে পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়—১৯ অক্টোবর বার্জ আক্রমণ করে ডুবিয়ে দেওয়া, দিরাই-শাল্লায় অস্ত্র ছাড়াই ১০ রাজাকার আটক, হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নৌপথ দখলমুক্ত রাখা—এসবই ছিল জগৎজ্যোতির অদম্য নেতৃত্বের ফল।


“আমি যাইগা রে”—এক বীরের শেষ উচ্চারণ

১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র এক মাস আগে বদলপুরের ‘খইয়া গোপী’ বিলে এক অপারেশনে শত্রুবাহিনীর গুলিতে মাত্র ২২ বছর বয়সে শহীদ হন এই মহাবীর। নিজের দলের সদস্যদের নিরাপদে সরে যেতে বললেও তিনি একাই এলএমজি হাতে যুদ্ধ চালিয়ে যান শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।


গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে তাঁর শেষ উচ্চারণ—“আমি যাইগা রে…”একটি উক্তি, যা আজও মুক্তিযোদ্ধাদের বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয়।


শহীদ হওয়ার পর শত্রুরা তাঁর দেহ নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালায়, বাজারে ঝুলিয়ে রাখে এবং শেষে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। তবুও তাঁর বীরত্বের আলো নিভে যায়নি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর সাহসিকতার গল্প পৌঁছে যায় কোটি মানুষের হৃদয়ে। যদিও তাঁকে মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, পরে তিনি পান বীরবিক্রম। অনেকের মতে—“জগৎজ্যোতি বীরশ্রেষ্ঠ হওয়ার যোগ্য ছিলেন। তাঁর মতো সাহসী যোদ্ধা ইতিহাসে বিরল।”


আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সেই বীর সন্তানকে—যার রক্তের বিনিময়ে এসেছে স্বাধীনতার আলো, যার আত্মদানের গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে শেখাবে—দেশের প্রতি প্রেমই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

পি ডি এস

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad