রোগীর ভিড়ে হাঁসফাঁস তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
সুনামগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন আজ একটি নীরব কষ্টের প্রতীক। চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালে জমে আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আর অপারেশন থিয়েটারের দরজায় তালা ঝুলছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। অচল পড়ে থাকা দামী যন্ত্রপাতিতে জমেছে ধুলো—আর চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষগুলো কেবল অপেক্ষা করছে কখন তাদের কষ্টের দিন শেষ হবে। এই হাসপাতালে নির্ভর করেন তিন লাখ মানুষের জীবনের আশা। কিন্তু সেবা দেওয়ার মতো মানুষই সেখানে নেই।
অনুমোদিত ১৪ চিকিৎসকের জায়গায় কর্মরত মাত্র ৬—দায়িত্বে কার্যত ৪ জন ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে থাকা উচিত ১৪ জন চিকিৎসক। কিন্তু বাস্তবে আছেন মাত্র ৬ জন, তার মধ্যে ২ জনের সংযুক্তি অন্যত্র। অর্থাৎ পুরো উপজেলার রোগীদের সেবা দিচ্ছেন মাত্র চারজন ডাক্তার। এই চারজনই সামলান বহির্বিভাগ, জরুরি সেবা, প্রসূতি, শিশু—সবকিছু।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন ৭০০–৮০০ রোগীর স্রোত এসে ভিড় করে হাসপাতালে। চিকিৎসকদের সামনে সারিবদ্ধ শত শত মানুষের মুখ—কেউ ব্যথায় কাতর, কেউ শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ দীর্ঘ দূরত্ব হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত।
বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান সেবা—এক বছর ধরে অচল অপারেশন থিয়েটার। গাইনি বিশেষজ্ঞ না থাকায় এক বছর আগে থেমে গেছে সিজারিয়ান সেবা। জীবন বাঁচানোর থিয়েটারটিও এখন নিঃশব্দ—যেন মৃত্যুর মতো নীরবতা। দামী যন্ত্রপাতিগুলো পড়ে আছে অচল হয়ে; পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হওয়ার পথে।
মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন দরিদ্র ও দূরবর্তী গ্রামগুলোর নারীরা—যাদের অনেককেই প্রসবের সময় জীবনের বাজি ধরে শহরের হাসপাতালে ছুটতে হয়।
মেডিসিন, গাইনি, শিশু, নাক-কান-গলা, অর্থোপেডিক্স, চর্ম, কার্ডিওলজি—প্রতিটি বিভাগে থাকা কথা ১ জন করে বিশেষজ্ঞ। কিন্তু হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞহীন। ল্যাব টেকনিশিয়ানের তিনটি পদই শূন্য—ফলে অনেক রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই বের হয়ে যেতে হয় ২০–৩০ কিলোমিটার দূরের শহরে।
সরেজমিন দেখা গেল—বহির্বিভাগে রোগীর লম্বা সারি; কোথাও বসার জায়গাও নেই। টিকিট কাউন্টারের সামনে হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষের ভিড়। ডাক্তারদের রুমের বাইরে শত শত মানুষের অপেক্ষা—চোখে উদ্বেগ, মুখে প্রার্থনা।
চিকিৎসা নিতে আসা আছিয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—“রোগী বেশি, ডাক্তার কম… সারাদিন অপেক্ষা করি, তবু ঠিকমতো দেখা হয় না।”
আরেক রোগী বলেন—“সরকারি হাসপাতালে যদি চিকিৎসাই না পাই, তাহলে যাব কোথায়? ডাক্তার নেই—সবাই কষ্টে।” পরিকল্পনাহীনতার শিকার সাধারণ মানুষ।
দীর্ঘদিন ধরে শূন্যপদ পূরণ না হওয়ায় হাসপাতালের সেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে।যেখানে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মানুষের সুস্থতার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা—সেখানে তাহিরপুরের মানুষ জর্জরিত অনিশ্চয়তা, ভাঙাচোরা সেবা আর অনাদরে।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাসাদ আহমেদ হতাশা প্রকাশ করে বলেন—“চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি বহুবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বারবার বলেছি—তবুও শূন্যপদ পূরণ হয়নি। চিকিৎসক পেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।” তার কথায় অসহায়ত্বের সুর স্পষ্ট—যেন তিনিও মানুষ বাঁচাতে চাইলেও কাঠামোগত সমস্যায় আটকে আছেন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: