সুনামগঞ্জ–১: হাওরের ভোটের অঙ্কে সম্পদ, পেশা আর প্রভাব
Led Bottom Ad

সুনামগঞ্জ–১: হাওরের ভোটের অঙ্কে সম্পদ, পেশা আর প্রভাব

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

০৩/০১/২০২৬ ১২:৫৪:১০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হাওরের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্রাম, জলাভূমি ও ফসলি জমির বাস্তবতার ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে সুনামগঞ্জ–১ সংসদীয় আসনের রাজনীতি। ধর্মপাশা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর—এই চার উপজেলা নিয়ে গঠিত জেলার সবচেয়ে বড় এই আসনটিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা এখন স্পষ্ট। কে কতটা সম্পদশালী, কার সামাজিক প্রভাব কত দূর বিস্তৃত, আর কে মাঠপর্যায়ে কতটা সংগঠিত—এসব প্রশ্ন ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে ভোটের হিসাব।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আসনে ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আয়, সম্পদ, পেশা ও দায়-দেনার দিক থেকে তাদের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও এসব তথ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, হাওরাঞ্চলের এই আসনে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও নির্বাচনী ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

মনোনয়ন দাখিলকারীদের মধ্যে বিএনপির দুইজন প্রার্থী রয়েছেন। দলীয় সূত্র জানায়, আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে একজনকে চূড়ান্ত করা হবে। অপর চারজন প্রার্থী বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। ফলে মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন বহুমাত্রিক, তেমনি ভোটের সমীকরণও জটিল হয়ে উঠেছে।

হলফনামা অনুযায়ী, প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসা ও কৃষিভিত্তিক পেশার আধিক্য চোখে পড়ে। ছয়জনের মধ্যে চারজন নিজেদের পেশা হিসেবে ব্যবসা ও কৃষির কথা উল্লেখ করেছেন। দুজন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত, আর একজন অতীতে চিকিৎসক ও শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাওরাঞ্চলে কৃষি ও ব্যবসাভিত্তিক পেশার প্রার্থীরা তৃণমূল পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পান।

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনিসুল হক পেশায় ব্যবসায়ী। হলফনামা অনুযায়ী, ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ৭২ লাখ টাকার বেশি। বাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা থেকে ভাড়া বাবদও তার উল্লেখযোগ্য আয় রয়েছে। তার ও স্ত্রীর নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। তবে বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে তার নামে রয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি ঋণ—যা অন্য প্রার্থীদের তুলনায় বেশ বড় অঙ্ক।

বিএনপির আরেক প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল পেশায় ব্যবসায়ী ও কৃষক। তার ঘোষিত বার্ষিক আয় তুলনামূলকভাবে কম হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রায় ২০ একর যৌথ কৃষিজমি তাকে স্থানীয়ভাবে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে তার নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত দুজন তুলনামূলকভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী তোফায়েল আহমদের আয় মূলত শিক্ষকতা নির্ভর। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী মাওলানা মুজাম্মিল হক তালুকদারের সম্পদের বড় অংশ কৃষিজমি ও ব্যাংক আমানত। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রার্থীরা সৎ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণে একটি নির্দিষ্ট ভোটার শ্রেণির সমর্থন পেতে পারেন। তবে বড় পরিসরের নির্বাচনী প্রচারণায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্পদের দিক থেকে অন্যদের ছাড়িয়ে গেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। চিকিৎসক ও শিক্ষকতা পেশার অভিজ্ঞতা শেষে বর্তমানে তিনি ব্যবসায়ী। হলফনামা অনুযায়ী, তার ও স্ত্রীর নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য প্রায় ১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা—এই আসনের সব প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ। তার আয়ের বড় অংশ আসে বাসা ও বাণিজ্যিক ভবন থেকে আদায়কৃত ভাড়া থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুখলেছুর রহমানের ঘোষিত সম্পদ ও আয় তুলনামূলকভাবে কম। তার আয় মূলত ব্যবসা ও ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল।

সুনামগঞ্জ–১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৪১ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪০ হাজার ৯১৫ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ছয়জন। ২৩টি ইউনিয়নের ১৭৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

সব মিলিয়ে হলফনামা বিশ্লেষণ বলছে, সুনামগঞ্জ–১ আসনের নির্বাচনী লড়াই কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে সম্পদ, পেশা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক শক্তি—সবকিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হবে ভোটের ভাগ্য। শেষ পর্যন্ত হাওরের মানুষের রায়ই ঠিক করবে, কে হবেন এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad