তাহিরপুরের হাওরে বোরো জমিতে আতঙ্ক, ভাঙা কাচে আহত অর্ধশতাধিক কৃষক
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে পানি শুকিয়ে জেগে উঠেছে বোরো চাষের জমি। কিন্তু সেই জমিতে নতুন এক আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাঙা কাচ—মূলত মদের বোতলের টুকরো। এসব ভাঙা কাচে হাত-পা কেটে গুরুতর আহত হচ্ছেন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমেই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে অন্তত অর্ধশতাধিক কৃষক ও শ্রমিক আহত হয়েছেন। গত পাঁচ বছরে এই সংখ্যা তিন থেকে চার শতাধিক বলে দাবি স্থানীয়দের। আহতদের অনেকেই কাজ করতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অপরদিকে, আহত হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
ফলে বোরো মৌসুমের ভরা সময়ে জমিতে নামতে পারছেন না অনেক কৃষক। দৈনিক মজুরিতে কাজ করা শ্রমিকরাও ঝুঁকি নিয়ে হাওরে যেতে চাইছেন না। এতে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, লাকমা ছড়াসহ তাহিরপুরের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখো পর্যটক ভ্রমণে আসেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদক ও মদ্যপান শেষে খালি বোতল হাওরের পানিতে ফেলে দেন। বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা এসব বোতল শুকনো মৌসুমে জমির মাটির সঙ্গে মিশে যায়। পরে ট্রাক্টর দিয়ে হালচাষের সময় বোতল ভেঙে ধারালো কাচে পরিণত হয়, যা কৃষকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
মাটিয়ান হাওরপাড়ের বড়দল গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াস আহমেদ বলেন, ‘ফজলুল বারী, জামাল মিয়া, ফয়জুন্নুর, আবদুল হালিমসহ আমাদের গ্রামের ২০-২৫ জন গরিব কৃষক কাচের টুকরোয় হাত-পা কেটে গুরুতর আহত হয়েছেন। ধান লাগানোর ভরা মৌসুমে তারা এখন ঘরে বসে আছেন।’
একই হাওরের কৃষক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এখন জমিতে পা দিলেই ভয় লাগে। চারা রোপণ করতে গেলে হাত কেটে যায়। হাত-পা কেটে গেলে তো আর চাষাবাদ করা সম্ভব না। শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না, বেশি টাকা দিলেও না।’
সম্প্রতি মাটিয়ান হাওরে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করতে গিয়ে কৃষক মো. বশির মিয়ার পা কেটে যায়। তিনি জানান, আটটি সেলাই দিতে হয়েছে। ‘এরপর থেকে আর মাঠে নামতে পারছি না,’ বলেন তিনি।
এ অবস্থায় সচেতন মহল দাবি করছেন, পর্যটন মৌসুমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং বর্ষা মৌসুমে পর্যটক পরিবহনকারী হাউসবোট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। না হলে কৃষকদের এই দুর্দশা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। ইউপি সদস্য সামায়ুন মিয়া বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে সমস্যা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘কাঁচের বোতলে আহত হওয়ার বিষয়টি শুনেছি। তবে এখনো কেউ লিখিতভাবে জানায়নি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।’
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ‘কৃষকদের স্বার্থে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এ রহমান
মন্তব্য করুন: