সরকারি হিসাবে ২০ হাজার হেক্টর, মাঠের হিসাবে কৃষকের মেরুদণ্ড শেষ
হাওর ভরা ধান আছিল, পানির নিচে তলাইয়া গেল। অহন মানুষে আধাআধি ভাগে নিয়া যাইতাছে, আর আমি মালিক হইয়া দূর থাইক্যা চাইয়া চাইয়া দেখতাছি। আল্লায় আমার কপালে এইডা কী লিখল? এভাবেই নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে বিলাপ করছিলেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বড় কৃষক জাহির মিয়া।
তাঁর এই বিলাপ কেবল একক কোনো ব্যক্তির নয়, বরং এটি বর্তমানে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কয়েক হাজার কৃষকের সম্মিলিত আর্তনাদ। কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। আর এই পরিস্থিতির সুযোগে হাওরাঞ্চলে ফিরে এসেছে এক সময়কার অভিশপ্ত প্রথা 'নয়নভাগা'।
স্থানীয় ভাষায় 'নয়নভাগা' হলো চরম বিপর্যয়ের এক নাম। যখন ধান কাটার সময় হয়ে আসে কিন্তু মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়, তখন জমির মালিক নিজে বা স্বাভাবিক পারিশ্রমিকে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে পারেন না। তখন এক বিশেষ চুক্তিতে অন্য লোকজন বা শ্রমিকরা ধান কাটে। নিয়ম অনুযায়ী, সংগৃহীত ধানের অর্ধেক শ্রমিক নিয়ে যায় আর বাকি অর্ধেক পায় জমির মালিক।
কিন্তু বাস্তবতা আরও করুণ। পানির গভীরতা বেশি হলে মালিকের ভাগে কিছুই জোটে না, অথবা কেবল দূর থেকে চেয়ে দেখা ছাড়া উপায় থাকে না বলেই একে ‘নয়নভাগা’ (চোখে দেখা ভাগাভাগি) বলা হয়।
বড়দল গ্রামের জাহির মিয়া প্রায় ৫০ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। আশা ছিল এক হাজার মণ ধান ঘরে তুলবেন। কিন্তু শনির হাওর আর মাটিয়ান হাওরের পানি তাঁর অর্ধেকের বেশি জমি গিলে খেয়েছে। জাহির মিয়া বলেন, “আর কয়ডা দিন সময় পাইলে ফসলটা ঘরে তুলতে পারতাম। এহন দেনা শোধ করমু কেমনে আর সংসার চালাইমু কী দিয়া?”
একই চিত্র শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামের স্বপন দাস, নারায়ণ দাস আর ভক্ত সূত্রধরের। তিন একর জমিতে ৩শ মণ ধানের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন স্বপন দাস। আজ তাঁর সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে উপোস থাকার উপক্রম। তিনি জানান, সব ধান এখন পানির নিচে, মানুষ 'নয়নভাগায়' নিয়ে যাচ্ছে। খড় শুকানোর জায়গাটুকুও নেই, তাই গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তিনি।
হাওরের কৃষকদের মতে, এবারের এই বিপর্যয়ের জন্য কেবল বৃষ্টি নয়, বরং অপরিকল্পিত পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থাও দায়ী। জামালগঞ্জের আলিপুর গ্রামের কৃষক ওয়াসিম মিয়া ক্ষোভের সাথে বলেন, “খাল-নদীগুলা পলি পইড়া ভরাট হইয়া গেছে। বৃষ্টির পানি নামার কোনো জায়গা নাই। বাঁধে সমস্যা নাই, সমস্যা হইলো খালগুলা ভরাট হওয়া।”
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, যাদুকাটা, ডাউকি, বৌলাই ও সুরমাসহ প্রধান প্রধান নদীগুলোর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানান, বেড়িবাঁধগুলো এখনো সুরক্ষিত থাকলেও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা দুর্ভোগে পড়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক জানান, জেলায় এ বছর ১ লাখ ২৩ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শনিবার বিকাল পর্যন্ত বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি নিমজ্জিত হয়েছে। ব্রি-৮৮, ৮৯ ও ৯২ জাতের ধানগুলোর প্রায় ৬৬ শতাংশ ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে বলে দাবি সরকারি দপ্তরের।
তবে কৃষকদের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। নিমজ্জিত ধান কাটার ব্যয় এত বেশি যে অনেক কৃষক ধান কাটতেই পারছেন না।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের এই অকাল দুর্যোগ কেবল কৃষকের ফসলের ক্ষতি নয়, বরং স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। 'নয়নভাগা' চুক্তিতে ধান কেটে কৃষক কেবল ঋণের বোঝাই বাড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা না করলে এই অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: