শেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় ক্রেতারা
মৌলভীবাজারে পশুর হাটে দেশীয় পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও বেচাকেনা কম
পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, মৌলভীবাজার জেলার পশুর হাটগুলো ততই জমে উঠতে শুরু করেছে; জেলার আদমপুর, টেংরা, ব্রাহ্মণবাজার, শমশেরনগর ও ভৈরব বাজারসহ প্রধান প্রধান পশুর হাটে সম্পূর্ণ দেশীয় খামারে লালন-পালন করা গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সরবরাহ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে হাটে পশুর এই বিপুল সরবরাহ থাকলেও বিক্রেতা ও খামারিরা চরম হতাশা প্রকাশ করে বলছেন যে, সেই তুলনায় বাজারে ক্রেতাদের সমাগম এখনো বেশ কম এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না তাঁরা; অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের পাল্টা অভিযোগ— বাজারে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে থাকা ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর দাম বিক্রেতারা এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হাঁকছেন।
জেলার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে গভীর সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত কোরবানিযোগ্য পশু নিয়ে স্থানীয় বড় বড় খামারি ও প্রান্তিক কৃষকদের সরব উপস্থিতি থাকলেও প্রকৃত বেচাকেনা এখনো বেশ ধীরগতির; বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর সামনে সাধারণ ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও দীর্ঘক্ষণ দরদামের পর পশুর দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন। এবারের কোরবানির বাজারে বড় সাইজের গরুর চাহিদা ও দরদাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম ও ধীরগতির হলেও মৌলভীবাজারের গ্রামীণ জনপদ ও শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
শমশেরনগর পশুর হাটে কোরবানি উপলক্ষে গরু কিনতে আসা মোফাজ্জল হোসেন নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “একটি মাঝারি সাইজের গরুর দাম বিক্রেতা প্রথমে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন; পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে দরদাম করার পর শেষমেশ ৯৫ হাজার টাকায় আমি গরুটি কিনতে সক্ষম হয়েছি।”
বাজারে আসা সিংহভাগ ক্রেতাদের দাবি, বিগত বছরের কোরবানির বাজারের তুলনায় এবারের বাজার পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় মনে হলেও বিক্রেতারা শুরুতেই অনেক বাড়তি দাম প্রত্যাশা করে বসে আছেন; ফলে অনেক সচেতন ক্রেতাই হাটের শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছেন, যাতে ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে পশুর দাম আরও কিছুটা কমে আসে। অন্যদিকে পশুর দাম বেশি রাখার পেছনে খামারিরা গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ তুলে ধরে বলছেন যে, গত এক বছরে বাজারে সব ধরনের গো-খাদ্য, ভুসি, খৈল, খড় ও প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এতে প্রতিটি পশুর দৈনিক লালন-পালন ও মোটাতাজাকরণ ব্যয় এক লাফে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে; ফলে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কম দামে পশু বিক্রি করলে লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে খামারের মূলধন বা আসল টাকা তোলাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
শমশেরনগরের স্থানীয় দুই ডেইরি ও পশু খামারি রাজু ও কাইয়ুম মিয়া অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলেন, “আমাদের খামারে কোরবানি দেওয়ার মতো যে কয়টি গরু প্রস্তুত ছিল, তার মধ্যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অর্ধেক গরু কোনো রকমে বিক্রি করতে পেরেছি; কিন্তু আমরা খামারিরা যেভাবে আশা করেছিলাম, সে রকম লাভজনক বা আশানুরূপ দাম একেবারেই পাইনি এবং বাজারে আসা ক্রেতারা পশুর উৎপাদন খরচের চেয়েও অনেক কম দাম বলছেন, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে খামার চালানো আমাদের জন্য খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
মৌলভীবাজারের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুল আলম খান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানান, এবার মৌলভীবাজার জেলায় কোরবানির পশুর মোট চাহিদার তুলনায় দেশীয় পশুর সরবরাহ অনেক বেশি রয়েছে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি অনুমোদিত পশুর হাটে বিশেষ মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছে, যাতে বাজারে কোনো অসুস্থ বা ক্ষতিকর নিষিদ্ধ হরমোন ওষুধ প্রয়োগ করা কৃত্রিম পশু কেউ বিক্রি করতে না পারে। তিনি আরও বলেন, হাটগুলোতে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি টিম, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিশেষ সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে, যাতে সাধারণ ক্রেতারা সম্পূর্ণ রোগমুক্ত ও নিরাপদ পশু নিশ্চিন্তে কিনতে পারেন এবং কোরবানি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পশুর পরিবহন ও হাট ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অফিসিয়াল ও সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলায় কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে মোট প্রায় ৭৪ হাজার ৫৮৪টি, যার মধ্যে রয়েছে ৩৯ হাজার ৪৮১টি সুস্থ গরু, ১ হাজার ৪৪৬টি মহিষ, ৩০ হাজার ৮২২টি ছাগল এবং ২ হাজার ৮৩৫টি ভেড়া; অথচ এবারের ঈদে পুরো মৌলভীবাজার জেলার মোট পশুর স্থানীয় চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১4৭২টি পশু, যার ফলে স্থানীয় পারিবারিক চাহিদা শতভাগ পূরণ করার পরও অতিরিক্ত ৩ হাজার ১১২টি কোরবানিযোগ্য পশু দেশের অন্যান্য জেলা ও রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলোতে অনায়াসে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: