ইতিহাসের বুকফাটা আর্তনাদ
নদী আর মানুষের লোভে বিলীনের পথে প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নেমে আসা পিয়াইন নদী, ওপাড়ে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড় আর পায়ের নিচে রূপালি পাথর—সিলেট মানেই তো প্রকৃতির এই অপরূপ ক্যানভাস, আমাদের চিরচেনা জাফলং। কিন্তু এই মায়াবী রূপের আড়ালেই যেন লুকিয়ে আছে এক বুকফাটা কান্না। পর্যটকদের কোলাহল আর পাথরের যান্ত্রিক শব্দের আড়ালে নীরবে, নিভৃতে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে ইতিহাসের এক জীবন্ত উপাখ্যান—‘প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে রাজবাড়ীটি এই জনপদের শৌর্য-বীর্যের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, আজ নদীভাঙন, অবৈধ পাথর উত্তোলন আর আমাদের চরম অবহেলার শিকার হয়ে সেটি মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
জাফলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজবাড়ীটির দিকে তাকালে এখন বুকটা হাহাকার করে ওঠে। অতীতের সেই রাজকীয় জাঁকজমক আর গৌরব আজ বিলীন। প্রাসাদটির একটা বিশাল অংশ ইতিমধ্যেই রাক্ষুসে নদীর পেটে চলে গেছে। যে সামান্য অংশটুকু এখনো কোনোমতে টিকে আছে, তা যেন প্রকৃতির বুক চিরে বাঁচার জন্য এক করুণ আকুতি জানাচ্ছে।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, সিন্টেং রাজবংশ প্রতিষ্ঠার আগে এই জৈন্তিয়া অঞ্চলটি ছিল কয়েকটি স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের সমষ্টি। জাফলং, জৈন্তাপুর, চারিকাটা ও ফালজুর ছিল এর মধ্যে অন্যতম। ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই রাজ্যগুলো একীভূত হয়ে জন্ম নেয় এক বিশাল জৈন্তিয়া রাজ্যের। তখন প্রশাসনিক কেন্দ্র চলে যায় জৈন্তাপুরের নিজপাটে, আর জাফলং ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাতে থাকে।
তবে গুরুত্ব হারালেও এই রাজপ্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়নি। প্রকৃতির গভীর মমতায় শত শত বছর ধরে টিকে ছিল এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী। ধারণা করা হয়, জৈন্তিয়ার রাজারা প্রায়ই এই জাফলং রাজবাড়ীতে এসে অবস্থান করতেন এবং এর যত্ন নিতেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রাসাদটি তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, জৈন্তিয়া রাজ্যেরও আগে, অর্থাৎ তেরো শতকের দিকে এটি ছিল ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের রাজধানী; যেখান থেকে রাজ্য শাসন করতেন নিয়াং রাজা, কল্লং রাজা ও মাইলং রাজার মতো পরাক্রমশালী শাসকেরা।
১৮৩৫ সালে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে জৈন্তিয়া রাজ্যের পতন ঘটে, ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় এই রাজবাড়ীর ট্র্যাজেডি। ব্রিটিশরা এই প্রাচীন স্থাপত্যের কোনো যত্ন তো নেয়ইনি, উল্টো তাদের অবহেলায় ধ্বংস হতে থাকে রাজপ্রাসাদের দেয়াল ও দালানকোঠা। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে আমাদের নিজেদের হাত ধরে। স্বাধীনতার পর থেকে জাফলংয়ে শুরু হয় পাথর আর বালু উত্তোলনের এক নির্মম মহোৎসব। মানুষের সীমাহীন লোভের বলি হতে থাকে প্রকৃতি। নির্বিচারে নদী থেকে পাথর তোলার ফলে বদলে যায় জাফলং নদীর গতিপথ। ক্ষ্যাপাটে নদীর ভাঙনে ধসে পড়তে থাকে ইতিহাসের এক একটি ইট। রাজবাড়ীর মূল অংশ চোখের পলকে তলিয়ে যায় নদীগর্ভে।
আজ সেখানে গেলে শুধু এক টুকরো দীর্ঘশ্বাসই সঙ্গী হয়। চারপাশের দেয়ালগুলো বহু আগেই ধুলোয় মিশে গেছে। এখন কোনো রকমে কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে রাজবাড়ীর দক্ষিণ পাশের দেয়াল আর জীর্ণপ্রায় রাজকীয় ফটকটি। পূর্ব পাশের দেয়ালের অর্ধেকটা আর পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারটি এখনো যেন কোনোমতে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে—যেন বলতে চাইছে, "আমাদের বাঁচাও!" পশ্চিম আর উত্তর পাশের দেয়ালের অস্তিত্ব তো বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এখন কেবলই আশঙ্কা আর মন খারাপের ছায়া। তারা বলছেন, আর কিছুদিন যদি এভাবে চলে, তবে জাফলং রাজবাড়ীর অবশিষ্ট চিহ্নটুকুও নদীগর্ভে চিরতরে হারিয়ে যাবে।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন এই অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদটি রক্ষায় এখনই যদি রাষ্ট্র ও প্রশাসন জরুরি পদক্ষেপ না নেয়, তবে হয়তো আর কয়েক বছর পর জাফলংয়ে শুধু পাথরই পড়ে থাকবে, ইতিহাস থাকবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো কোনোদিন আর চোখের সামনে এই রাজবাড়ী দেখার সৌভাগ্য লাভ করবে না; তারা শুধু বইয়ের পাতায় পড়ে আফসোস করবে আর আমাদের দায়বদ্ধতাহীনতাকে ধিক্কার দেবে। এখনো সময় আছে, এই শেষ চিহ্নটুকু অন্তত বাঁচিয়ে রাখা হোক।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: