সুনামগঞ্জে ১৭০০ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাতে ঈদের রাজকীয় ভোজ

নেপথ্যে একঝাঁক মানবিক তরুণ

সুনামগঞ্জে ১৭০০ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাতে ঈদের রাজকীয় ভোজ

লতিফুর রহমান রাজু. সুনামগঞ্জ

২৯/০৫/২০২৬ ২২:১৮:৪২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ঈদের দিন মানেই তো আনন্দের ভাগাভাগি, উৎসবের আলো। কিন্তু এই আলো কি সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছায়? এক টুকরো মাংসের আশায় ঈদের দিন কত শত চেনা-অচেনা মুখকে ঘুরতে হয় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। হয়তো কাঁচা মাংস মেলে, কিন্তু পরম মমতায় তা রান্না করে সুস্বাদু পদে কেউ তাঁদের পাতে তুলে দেয় না। সমাজের এই আড়ালে থাকা মানুষগুলোর মুখে ঈদের অনাবিল হাসি ফোটাতে এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্ত স্থাপন করল সুনামগঞ্জের একঝাঁক মানবিক তরুণ।


পবিত্র ঈদুল আজহার দিন সুনামগঞ্জ শহরের অভিজাত 'প্রিয়াঙ্গন কমিউনিটি সেন্টার' রূপ নিয়েছিল এক টুকরো স্বর্গরাজ্যে। সেখানে কোনো ধনী বা ভিআইপিদের ভিড় ছিল না; ছিল সমাজের ১৭০০ জন সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশু। তাঁদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজের। সুগন্ধি পোলাও, খাসির মাংস (বিফ কারি), ডাল আর শেষ পাতে দই—তীব্র তৃপ্তি আর পেট ভরে খাওয়ার পর এই মানুষগুলোর চোখে-মুখে যে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠেছিল, তার মূল্য যেন কোটি টাকার চেয়েও বেশি!


২০২৩ সালে এক বুক স্বপ্ন আর আর্তমানবতার সেবার ব্রত নিয়ে মানবিক তরুণ সমাজসেবক ইজাজুল হক চৌধুরী নাসিম তাঁর বন্ধুদের সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি ব্যতিক্রমী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন—'সোশ্যাল চ্যারিটি ফাউন্ডেশন'। নাসিমের সাথে এই স্বপ্নের সারথি হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছেন মাহফুজুর রহমান তপু, আল আবি শারজিল, সাইফুল ইসলাম রাহী, আকমল হোসেন তিতাস, পরাগ, বক্কর ও অনিকের মতো একঝাঁক নিঃস্বার্থ তরুণ।


বিগত চার বছর ধরে প্রতি ঈদে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের নামী কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে খাওয়ানোর এই মহতি উদ্যোগ সফলভাবে করে আসছে এই সংগঠনটি। কেবল ঈদেই নয়, পুরো রমজান মাস জুড়ে শহরের প্রিয়াঙ্গন মার্কেটের সামনে অসহায় রোজাদারদের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ, কিংবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে 'বেঁচে থাকার লড়াই' প্রজেক্টের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—সবখানেই এই তরুণদের উপস্থিতি যেন আশার আলো ছড়ায়। এমনকি সমাজের মধ্যবিত্ত পরিবার যারা লোকলজ্জায় হাত পাততে পারেন না, তাঁদের কাছেও গোপনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এই সংগঠনটি।


সোশ্যাল চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের প্রধান সমন্বয়ক ইজাজুল হক চৌধুরী নাসিম আবেগময় কণ্ঠে বলেন: "ঈদের দিনে এই সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা এক টুকরো মাংসের আশায় বিভিন্ন বাড়ির দ্বারে দ্বারে ঘোরে। কেউ তাঁদের রান্না করা সুস্বাদু খাবার আদর করে পরিবেশন করে খাওয়ায় না। আমরা চেয়েছি, অন্তত ঈদের দিনটায় তাঁরা যেন নিজেদের অবহেলিত না ভাবেন। কিছু মহৎ প্রাণ প্রবাসী ও দেশের সুহৃদদের আর্থিক সহযোগিতা এবং আমাদের নিজেদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আমরা এই প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি। মানবতার কল্যাণে আমাদের এই পথচলা চিরকাল অব্যাহত থাকবে।"


ঈদের দিনে এমন চমৎকার ও পরম যত্নে সাজানো আয়োজনে পেটভরে খেতে পেরে আগত সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা হাত তুলে দোয়া করেছেন এই তরুণদের জন্য। তাঁদের চোখের কোণের অশ্রু আর ঠোঁটের হাসিই ছিল আয়োজকদের সব ক্লান্তি ধুয়ে দেওয়ার মহৌষধ।


স্থানীয় সুধীসমাজ ও বিশিষ্টজনেরা সোশ্যাল চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের এই তরুণদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, আজকের দিনে যখন মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, তখন এই তরুণদের এমন নিঃস্বার্থ মানবিকতা সমাজের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা। এই তরুণেরাই আমাদের অহংকার, এরাই আগামীর সুন্দর বাংলাদেশের কারিগর। তরুণদের এই আলো ছড়ানো পথচলা দীর্ঘজীবী হোক!

এল আর রাজু/ ডি আর ডি

মন্তব্য করুন: