লাউয়াছড়া বনের ভেতর রেললাইন
পর্যটকদের কাছে যতটা আকর্ষণ, ততটাই বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পর্যটন মানচিত্রে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি বন, শতবর্ষী বৃক্ষ, পাখির কলতান আর বন্য প্রাণীর বিচরণ সব মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হলেও, এই বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেললাইন পর্যটকদের কাছে যেমন আকর্ষণের, ঠিক তেমনই বড় এক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় এলাকাটি ‘ভানুগাছ পাহাড়’ নামে পরিচিত থাকলেও, পরে সরকার এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে এবং গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে লাউয়াছড়া দেশের পরিবেশ ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই উদ্যানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বনের বুক চিরে চলে গেছে ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথ, যার ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ট্রেন এগিয়ে চলার দৃশ্য পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। এই নান্দনিক দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করতে অনেকেই রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে বা ওপরে উঠে ছবি তোলেন, ভিডিও ধারণ করেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য রিলস তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে এই আকর্ষণের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি। স্থানীয় বাসিন্দা ও বনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, ট্রেন চলাচলের সময় অনেক পর্যটক অসচেতনভাবে রেললাইনের ওপর বা খুব কাছাকাছি অবস্থান করেন এবং চলন্ত ট্রেনের ছবি তুলতে গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন না, যার ফলে অতীতেও লাউয়াছড়া এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ হওয়ায় ট্রেনের শব্দ সবসময় দূর থেকে স্পষ্টভাবে শোনা যায় না, বিশেষ করে ছবি তোলা বা মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় দর্শনার্থীরা আশপাশের পরিস্থিতির প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন।
পরিবেশবাদী ও পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি সুন্দর ছবি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস কখনোই জীবনের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না, কারণ রেললাইন কোনো পর্যটন স্পট নয়—এটি একটি সচল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন পথ। লাউয়াছড়ার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে যেন কাউকেই দুর্ঘটনার শিকার হতে না হয়, সেজন্য দর্শনার্থীদের নির্ধারিত হাঁটাপথ (ট্রেইল) ব্যবহার করা এবং রেললাইন অতিক্রমের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, যেন একটি মুহূর্তের অসাবধানতা আনন্দময় ভ্রমণকে আজীবনের কান্নায় পরিণত না করে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: