টাঙ্গুয়ার হাওরে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগান

হুমকীর মুখে জীববৈচিত্র্য

টাঙ্গুয়ার হাওরে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগান

প্রথম ডেস্ক

০৫/০৬/২০২৬ ১২:২৯:৩২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রামসার সাইট, অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ও বিরল জীববৈচিত্র্যের আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ আধার সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে সাম্প্রতিক সময়ে এক চরম উদ্বেগজনক হারে উজাড় হচ্ছে হাওরের প্রধান রক্ষাকবচ হিজল ও করচ বনের হাজার হাজার গাছ; প্রশাসনের দুর্বল নজরদারি, তীব্র জনবল সংকট ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাবে হাওরের চিরন্তন প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সরাসরি অভিযোগ, এলাকাভিত্তিক একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও অসাধু চোরা শিকারি চক্র দিনের আলোতে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এবং রাতের আঁধারে প্রকাশ্যেই এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান গাছ কেটে নির্বিচারে নিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবিদ ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশীয় এলাকার সংকটাপন্ন জলাভূমি বা ‘ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টাঙ্গুয়ার হাওর দীর্ঘদিন ধরে বিরল প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ, পরিযায়ী পাখি ও বিভিন্ন বন্য প্রাণীর অত্যন্ত নিরাপদ প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হিজল-করচ গাছ নির্বিচারে নিধনের ফলে হাওরের চিরচেনা পরিবেশগত ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে হাওরে অতিথি পাখির আগমন ও সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার পাশাপাশি চিরতরে বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে পড়ছে বিভিন্ন বিপন্ন প্রজাতির জলজ ও স্থলজ প্রাণী।

স্থানীয় হাওরবাসী ও মৎস্যজীবীরা জানান, হাওরের মাঝে অবৈধ উপায়ে চোরাই মাছের আশ্রয়স্থল বা ‘কাথা’ তৈরির নামে এবং নিজেদের রান্নার জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কুৎসিত উদ্দেশ্যে একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মিত হিজল-করচ গাছের ডালপালা, প্রধান কাণ্ড এমনকি গাছের গোড়াও কেটে উপড়ে ফেলছে; অনেক ক্ষেত্রে দিনের বেলায় বা রাতের অন্ধকারে গাছের গোড়ায় ধারালো কুড়াল দিয়ে গভীর আঘাত করে প্রথমে তা সুকৌশলে মেরে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে গাছটি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে ‘মৃত গাছ’ এর অজুহাত বা নাটক সাজিয়ে দিনের আলোতেই তা প্রকাশ্যে কেটে বাজারে বিক্রি ও নিয়ে যাওয়া হয়। সরেজমিনে টাঙ্গুয়ার হাওরের মূল ওয়াচ টাওয়ার (পাখি দেখার মিনার) সংলগ্ন পর্যটন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, শতাধিক বিশালাকার গাছের ডালপালা ধারালো করাত দিয়ে কেটে ন্যাড়া করে নেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি প্রাচীন গাছ গোড়া থেকে উপড়ে ফেলারও নগ্ন প্রমাণ মিলেছে; তবে ওয়াচ টাওয়ার থেকে ভেতরের দিকে দূরের দুর্গম বনাঞ্চল ও কান্দাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির এই চিত্র আরও ভয়াবহ ও রূপ নিয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা হোসেন আলী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনেকে নিজেদের জ্বালানির প্রয়োজনে বনের গাছ কেটে সাবাড় করছে, আবার কিছু গাছ গোপনে মেরে ফেলে মানুষ সেগুলো শুকিয়ে কেটে নিয়ে যায়; এত বড় হাওরে কে গাছ কাটছে আর কে চুরির মাল নিয়ে যাচ্ছে— এসব পাহারা বা তদারকি করার মতো সরকারি কোনো লোক বা মাঝিমাল্লা মাঠপর্যায়ে খুব একটা চোখেই পড়ে না।”

হাওরের সুশীল সমাজ ও কমিউনিটি নেতাদের অভিযোগ, হাওরের এই মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত সরকারি আনসার সদস্যরা চরম জনবল সংকটের কারণে এত বড় বিশাল জলমহাল ও বনে কোনো ধরনের কার্যকর দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না; এর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত বা কোনো দৃশ্যমান মনিটরিংয়ের অভাব পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল ও অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির কোষাধ্যক্ষ আবুল কালাম হাওরের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “বিগত বছরগুলোর আগের তুলনায় হাওরের হিজল-করচ গাছ এবং সুস্বাদু দেশীয় মাছ দুটোই অবিশ্বাস্য হারে কমে গেছে; এত বড় একটি আন্তর্জাতিক হাওর পাহারার জন্য সরকারিভাবে মাত্র তিনটি নামমাত্র ক্যাম্প রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই না। আগে হাওরে সার্বক্ষণিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কঠোর উপস্থিতি ও স্পট জুডিশিয়াল ট্রায়াল ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেটিও রহস্যজনক কারণে বন্ধ রয়েছে; অবিলম্বে যদি যথাযথ ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে গাছ ও মাছের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে।”

হাওরের এই আশঙ্কাজনক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএস (CNRS)-এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী সাইফুল চৌধুরী বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওরে বিভিন্ন মেয়াদে পরিবেশ সুরক্ষায় যে হাজার হাজার হিজল-করচ গাছ রোপণ করা হয়েছিল, তার অনেকগুলোই এখন মানুষের লোভের কারণে চরম অস্তিত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে; কেউ জ্বালানির জন্য, আবার কেউ মাছ চুরির নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা কাথা তৈরির নামে এই অপরাধ করছে। গাছ কাটার এই সর্বনাশা প্রবণতা যদি এখনই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে কঠোরভাবে দমন করা না যায়, তবে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের স্থায়ী ও অপূরণীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।” এদিকে হাওরে প্রকাশ্যে গাছ কাটা বন্ধে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কঠোর আইনি উদ্যোগ বা মামলা দেখা না গেলেও, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার জোরালো আশ্বাস দিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান; তিনি গণমাধ্যমকে জানান, “টাঙ্গুয়ার হাওরের গাছ কাটার বিষয়টি জানার পর পরই আমি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) টাঙ্গুয়ার হাওরে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি নজরদারি ও আনসার টহল বহুগুণ বৃদ্ধির কড়া নির্দেশ দিয়েছি; হিজল-করচ গাছ মূলত টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও মাছের প্রজননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তাই এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলাসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” টাঙ্গুয়ার হাওরের এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অনন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর ‘সাঁড়াশি অভিযান’ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দা, পরিবেশবাদী সংগঠন ও প্রকৃতিপ্রেমীরা; তাঁদের গভীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কঠোর ও আপসহীন নজরদারি এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল হাওরে গাছ কাটার এই কালো সিন্ডিকেটের প্রবণতা চিরতরে বন্ধ হবে এবং সুরক্ষিত হবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমির চিরন্তন পরিবেশ।


এ রহমান

মন্তব্য করুন: