সরকারি ক্রয়-বিক্রয়কেন্দ্র চালুর দাবিতে সুনামগঞ্জে বারকি শ্রমিকদের আলটিমেটাম
মোগল আমলের প্রাচীন ও শোষনমূলক ইজারাদারি প্রথার অবসান ঘটিয়ে সুনামগঞ্জের ধোপাজান ও যাদুকাটা বালিমহাল সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে। নদী ও পরিবেশ বিধ্বংসী অবৈধ ড্রেজার-বোমা মেশিনের তাণ্ডব বন্ধ এবং সাধারণ বারকি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষায় অবিলম্বে সরকারি ক্রয়-বিক্রয়কেন্দ্র চালুর দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘সুনামগঞ্জ জেলা বারকি শ্রমিক সংঘ’।
রবিবার (২১ জুন) বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ এই স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ছদরুল, সুনামগঞ্জ জেলা বারকি শ্রমিক সংঘের সভাপতি নাসির মিয়া, সহ-সভাপতি সিদ্দিক মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফরিদ মিয়া, সদস্য আবুল বাশার ও মরম আলীসহ সংগঠনের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
স্মারকলিপিতে নদী তীরবর্তী অববাহিকার লক্ষাধিক মানুষের জীবন-সংগ্রামের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। নেতারা বলেন, হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলা বছরের প্রায় ৮ মাসই জলমগ্ন থাকে। এখানে বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান বা বড় শিল্প-কারখানা না থাকায় তাহিরপুর ও সদর উপজেলার যাদুকাটা এবং ধোপাজান নদীই এখানকার কৃষিজীবী ও দিনমজুরদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক বারকি শ্রমিক সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে বেলচা, বালতি ও জাল ব্যবহার করে নদী থেকে বালি, পাথর ও কয়লা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
কিন্তু বর্তমানে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী, মুনাফালোভী ও সংঘবদ্ধ বালি-পাথরখেকো চক্র উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে নদী দুটিতে অবৈধ ড্রেজার ও পরিবেশ বিধ্বংসী ‘বোমা মেশিন’ (খননযন্ত্র) দিয়ে লুটপাট চালাচ্ছে। ড্রেজারের অবাধ ব্যবহারের ফলে নদীর তলদেশ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীর হয়ে পড়েছে। এর ফলে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার গ্রামগুলো ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে এবং বিলীন হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি।
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, মোগল আমলে প্রবর্তিত ইজারাদারি প্রথার আড়ালে মূলত জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা ও গুন্ডামির রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। মহালের ভেতরে অবৈধভাবে বিশালাকার ইঞ্জিনচালিত স্টিলবডি নৌকা প্রবেশ করিয়ে যান্ত্রিক উপায়ে বালি তোলায় সনাতন পদ্ধতির ছোট বারকি নৌকাগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার বারকি শ্রমিক। প্রশাসন মাঝে মাঝে লোকদেখানো ও দায়সারা অভিযান চালালেও রহস্যজনক কারণে এই অবৈধ যান্ত্রিক তাণ্ডব পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। উল্টো, এই জুলুম ও নদী খেকোদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে সাধারণ শ্রমিকদের নামে মিথ্যা মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
স্মারকলিপিতে অনতিবিলম্বে ইজারা পদ্ধতি বাতিল করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে মহাল পরিচালনার জোর দাবি জানিয়ে ৪টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।
শ্রমিক নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অনগ্রস জেলা সুনামগঞ্জের পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে যাদুকাটা ও ধোপাজান নদীকে ড্রেজারমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। অবিলম্বে এই দাবি মানা না হলে জেলার হাজার হাজার মেহনতি মানুষকে সাথে নিয়ে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
সজল আহমেদ / প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: