তালেবান শাসনেও এগোচ্ছে আফগান নারী উদ্যোক্তারা

তালেবান শাসনেও এগোচ্ছে আফগান নারী উদ্যোক্তারা

প্রথম ডেস্ক

২২/০৬/২০২৬ ০৪:০১:২৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

তালেবান শাসনে শিক্ষা, চাকরি ও জনজীবনের নানা ক্ষেত্র থেকে নারীদের ক্রমশ সরিয়ে দেওয়া হলেও আফগানিস্তানের অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা এক ভিন্ন চিত্রও সামনে এনেছে। কঠোর বিধিনিষেধের এই পরিবেশে বহু আফগান নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলছেন। সীমিত সুযোগ, সামাজিক চাপ ও প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও তারা ব্যবসাকে বেছে নিচ্ছেন আত্মনির্ভরতা, সম্মান এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম উপায় হিসেবে।


আফগানিস্তান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশটিতে ১০ হাজারের বেশি নারী বৈধ ব্যবসায়িক লাইসেন্স নিয়ে কাজ করছেন। গত পাঁচ বছরে এই সংখ্যা প্রায় দশ গুণ বেড়েছে। এর বাইরে আরও প্রায় এক লাখ ২০ হাজার নারী লাইসেন্স ছাড়াই ছোট ছোট ব্যবসায় যুক্ত আছেন। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসাই এখন আফগান নারীদের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।


তবে এই উত্থানের পেছনের গল্প মোটেও সহজ নয়। যেসব নারী একসময় আইনজীবী, প্রকৌশলী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তাদের অনেকে এখন বাধ্য হয়ে কার্পেট বুনন, প্রসাধনী উৎপাদন কিংবা কারিগরি প্রশিক্ষণভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। কারণ সরকারি চাকরি, বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নানা পেশায় নারীদের কাজের সুযোগ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।


জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত আফগান নারীদের মাত্র ৭ শতাংশ কোনো না কোনো কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপরও যারা উদ্যোক্তা হয়েছেন, তাদের কাছে ব্যবসা এখন শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি সামাজিক সংযোগ, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং বেঁচে থাকার এক গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।


হেরাত প্রদেশে নারী ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি বেহনাজ সালজুঘি বলেন, বর্তমান আফগানিস্তানে নারীদের জন্য আশার সবচেয়ে বড় জায়গা এখন ব্যবসা।


 শিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে গড়ে ওঠা কার্পেট সাম্রাজ্য


উত্তর আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফের ১৯ বছর বয়সী নাসিরা আজিজির জীবনও বদলে যায় তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর। ২০২১ সালে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে গেলে তার ভবিষ্যৎ যেন থমকে যায়। কিন্তু হতাশার সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি কার্পেট ব্যবসাকে নিজের নতুন পথ হিসেবে বেছে নেন।


ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন একটি বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে নাসিরার দুটি কারখানা রয়েছে, পাশাপাশি ঘরে বসেও কাজ করছেন অনেকে। সব মিলিয়ে তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৫০ জন কর্মী কাজ করছেন, যাদের বড় অংশই নারী।


নাসিরার ভাষায়, শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার মনে হয়েছিল জীবন যেন থেমে গেছে। কিন্তু কারখানাটি তাকে নতুন করে বাঁচার সাহস ও উদ্দেশ্য দিয়েছে।


প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন থেকে সাবান ব্র্যান্ডের মালিক


২১ বছর বয়সী রোকিয়া রেজায়ির স্বপ্ন ছিল খনি প্রকৌশলী হওয়ার। কিন্তু তালেবান শাসনে সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি ইংরেজি পড়ানো শুরু করলেও ব্যক্তিগত কোচিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ায় শিক্ষার্থী কমতে থাকে। তখন নতুন পথের সন্ধানে ২০২২ সালে হেরাতে তিনি ‘ম্যাগনোলিয়া’ নামে সাবান উৎপাদনের ব্যবসা শুরু করেন।


বর্তমানে এই ব্যবসার আয়েই চলছে তার সাত সদস্যের পরিবার। ছোট পরিসরের কারখানায় হাতে তৈরি হচ্ছে জাফরান ও ভেষজ উপাদানে প্রস্তুত নানা ধরনের সাবান। সীমিত অবকাঠামো নিয়েও রোকিয়ার স্বপ্ন বড়—তিনি ভবিষ্যতে ইরান ও তাজিকিস্তানের বাজারে প্রবেশ করতে চান। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ম্যাগনোলিয়া’কে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করাই তার লক্ষ্য।

 ‘বি কুইন’ ঘোঞ্চা কারিমির প্রতিদিনের লড়াই


হেরাতের মৌচাষি ঘোঞ্চা কারিমি আফগানিস্তানে ‘বি কুইন’ নামে পরিচিত। তার ৫০টি মৌচাক থেকে উৎপাদিত মধুই পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে নানা বাধা।


পুরুষ ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগে বিধিনিষেধ, চলাচলে সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক হয়রানি—সব মিলিয়ে তার ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে। কারিমি জানিয়েছেন, কখনও কখনও মৌচাক দেখভালের জন্য শহরের বাইরে যেতে হলে তাকে পুরুষের পোশাক পরে বের হতে হয়েছে। এমনকি ২০২৩ সালে নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে এক তালেবান কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধের জেরে তাকে ২০ দিন কারাবাসও করতে হয়েছে।


তার কথায়, একদিকে সরকার নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার কথা বলছে, অন্যদিকে বাস্তবে প্রতিদিনই নতুন নতুন বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।


 সরকারি বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর দূরত্ব


আফগান সরকারের শ্রম ও সামাজিক কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সামিউল্লাহ ইব্রাহিমি দাবি করেছেন, সরকার নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবে খুবই সীমিত এবং নারীদের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় তা বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারছে না।


আফগানিস্তানের উইমেনস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ফরিবা নুরি এই বাস্তবতাকে আরও আবেগঘনভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, তাদের মায়েরা সবসময় বলতেন—তারা কষ্ট করছেন যেন পরবর্তী প্রজন্ম ভালো ভবিষ্যৎ পায়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ আলোকিত হয়নি। এখন তারাও নিজেদের সন্তানদের একই কথা বলছেন, যদিও সেই প্রতিশ্রুতি কতটা সত্যি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।


সংগ্রাম থামেনি, থামেনি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও


আফগান নারী উদ্যোক্তাদের অনেককেই ব্যবসা চালাতে বাবা, ভাই বা স্বামীর সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে পরিবার ও রক্ষণশীল সামাজিক মূল্যবোধের চাপ, যা তাদের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।


তবু প্রতিকূলতার এই সময়েও আফগান নারীরা থেমে নেই। শিক্ষা ও চাকরির পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার পর ব্যবসাই এখন তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষা, স্বাধীনতা ধরে রাখা এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান ভরসা। তালেবানি শাসনের কড়াকড়ির মাঝেও তাই বহু নারী নিজের শ্রম, মেধা ও সাহস দিয়ে প্রমাণ করে চলেছেন—সুযোগ সীমিত হতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনাকে পুরোপুরি আটকে রাখা যায় না।

সজল আহমেদ

মন্তব্য করুন: