মনজুর মোহাম্মদ এর গুচ্ছ কবিতা ‘অবহেলার শৈলীতে মুড়ানো শিল্পগ্রাম’
পরিচয়ের খসড়া
*
ঘাসের কপালে সোনা চাঁদ আলোকের তুলি মাখা ছাপ
আমার পিতার পরিচয় রোদের গায়ে চিবানো ঘাম,
তার অধিক বিশেষণের গোত্র মুদ্রায় নিজের দাম
ভেবে দেখিনি তো কোনদিন কোট ভদ্র শরীরের খাম।
ভালোর দৌড় প্রদর্শনে বাড়াতে যাইনি গুণের জ্যাম
আর্যের জবানে লেগে যাক দলছুট এ বালকের নাম
লোভের মাঝে করিনি ধার শুধু জয়ের মনস্কাম
পরের বিজয় উল্লাসেও লোকসান কিনেছি পরিণাম।
হুজুগের সমুদ্র বিশ্বাস ভেড়াইনি তো স্বার্থের পালে
থেকেছি কেবল গোত্রহীন দ্বীপ্ত মননে লোভের কালে
এ আমার পরিচয় বন্ধু ভালো যদি বাসো তবে ধন্য
ভালোবাসার বাজারে আমি চাই না হতে বাহারি পণ্য
যে তুলিতে আঁচড় কেটেছে প্রকৃতি তার আপন মায়া
আমি তো শিল্প বিনাসের তুলি হয়ে ফেলব না ছায়া।
নিয়ম চক্র
*
স্নেহের বীজে ফলবান বিশ্বাসে
পশুও মানে তার প্রভুর আনুগত্যের নিয়ম,
নিয়মের জাতকে চন্দ্র বাবুই সুরুজের ভাই
পালকের দীনবন্ধু হাওয়ায় উড়ে যায়
সুবাসের সিঁথিপথ বাঁধানো ফুলেল আহ্বানে।
শরতের ফোঁটা ফোঁটা নিশিকান্তই
ঘাসের নোলকে সুরুজের আলজিভ
রাত্রির শরমে ফুটে শাপলার চাহনি
পদ্মের নিশি চোখ
ঝিঁঝির পাড়ায় কোরাস আর না ঘুম জোনাকির নিয়ম
নিয়মের চাদরে চিত্রকল্প ছয়ের পদছাপ আঁকা বাংলাদেশ
যেখানে ছবির ভেতরে শব্দ, শব্দের ভেতরে ছবি রুপ কথা কয়
হৃদয়কে তবলা বানিয়ে।
শুধু কান দিয়ে নয় হৃদয় দিয়ে শুনলে
মাটির ওলানে জন্মের প্রবাহিত অঙ্কুর
কেমনে কহে হাওয়াতে দিকের ইঙ্গিত
জলের জাজিমে ঢেউয়ের মাতমে কেওরালির ডুবো নাচ
অথবা পাখিদের বিরহ ভালোবাসা আর্তনাদের কেমন ভাষা
পালকের পোষা কৌশলে হাওয়াতে হুকুমের পথ চেপে কেনো দেশান্তরের এই মৌসুমি ভীড়
এতো সব কথার ভেতরে না বলা কল্পনার কলি
ফুটালে ভাবনার কুসুম
হাওতে ভেসে বেড়ায় তাঁহারই অন্তর সুবাসের সিনানে।
গাছেদের ত্বকে মাখা অযত্নের ছাপ
কখনও পাষাণের নির্দয় ফাটলে বটের সজীব বিদ্রোহ
কৃষক হয়ে ওঠে হৃদয়ের মাঠ।
কতোটা প্রেমের পরিমাপে কৃষকের হৃদয়
জমিনের জঙ্গলে হয় ফলদের পালোয়ান
গর্ভের ধারিণী তৃণের রানি।
প্রেম চোখে প্রেমিকের অন্তর শরমে মরমি শালুক
আঁখির পালকে ফুটে রয় মালুমের নসিহত
রাঙা পদ্মের ছিলক
বাড়ির হৃদয় যেমন হাসে সদর দরজার কারুকাজে শিল্পরূপ ওপারের ইতিহাস
তারই সিংহদ্বার,
ওইখানেই অবহেলার ক্ষত নিয়ে শুয়ে থাকা
পথের ভাষায় রচে তার অনুপাত
চাকার গুঁতোয় খুবলে ওঠা
কুমিরের কামড়ানো কোপ কোপ
ক্ষত পড়া ক্ষোভ চিহ্ন।
অথচ ফুলের সুবাসি হাওয়ায় হাটে কতটা অনুরাগ
তারই সুর রাগ তালের সুতোয় বাঁধা আকুলি বিকুলি
ভ্রমরের গুনগুন আর প্রজাপতির পাখায় রমণীয় রঙের
খেলা বেলা নিয়মের মাধুরি
সময়ের ভাষায় ফুটে কলি সুবাসে মাতায়
ইন্দ্রিয়ের রশ্মিতে টানে ফের রিপুর নিয়ম।
বসতি
*
ভাসমান হাঁসের মতো থৈ থৈ বাড়ি—ব্রিজ আর
একলা হিজলের হাওরে সূর্যাস্তের দুরের গ্রাম।
অথবা জলের জঞ্জালে ভাসমান শিল্প দুর্ভোগের
প্রতীক হয়ে দুর্গম জলের জাজীমে
ডুবো চাঁদের মতো ঘর—তরু—অসহায় ব্রিজ
গোধুলীর আলোয় রাঙানো সুরুজের
আইল পড়া বিকেল,
তা থৈ তা থৈ ঢেউয়ের মৃদু নাচে,
তরী নাচ যেনো জলোকার্পেটের প্রমোদ মাঠ।
ওখানে পায়ের পথে ছয় মাস জলের বেড়ি
বাকি ছয় মাস কাঁধে চড়ে পণ্য ছুটে
শহুরে পথের আগমনি পথ।
কষ্ট যেখানে নিয়তি,
জীবন সেইখানে সংগ্রাম।
সংগ্রামী মানুষের জীবনের দামে সাজে
শহরের বিলাসী জীবন
অথচ কৃষকের ত্যাগ থেকে যায়
অবহেলার শৈলীতে
মুড়ানো শিল্পগ্রাম দুর্গমের বসতি।
সজল
মন্তব্য করুন: