বাবার ১০ বিয়ের প্রতিবাদ করায় প্রান গেল ছেলের!
বরগুনার আমতলীতে বাবার ১০ বিয়ের প্রতিবাদ করায় ছেলে উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি রিপন কাজীকে (৩৫) হত্যা করা হয়েছে। বাবা মিজানুর ওরফে ভুট্টো কাজীর নেতৃত্বে চাচাতো ভাই ও গুলিশাখালী ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি রিফাত কাজী এবং তার সহযোগীরা রিপন কাজীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে পটুয়াখালী সদর উপজেলার গগণখা এলাকায় ফারুক ডাক্তারের বাড়ির সামনে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
বাবার ১০ বিয়েএ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মোস্তফা কাজী ও ফিরোজ কাজী নামের দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।
নিহত রিপন কাজী আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কালিবাড়ী গ্রামের মো. মিজানুর ওরফে ভুট্টো কাজীর ছেলে। তিনি ইউনিয়ন শ্রমিক দল সভাপতি ছিলেন।
জানা গেছে, বাবা মিজানুর কাজী দশ বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে বাবা ও ছেলে রিপন কাজীর মধ্যে দীর্ঘদিন বিরোধ চলে আসছিল। ওই বিরোধের জের ধরে ছেলে রিপন কাজী গত দুই বছর আগে বাবাকে পিটিয়ে তার পা ভেঙে দেয়। এর প্রতিশোধ নিতে বাবা মিজানুর কাজী গত ফেব্রুয়ারি মাসে ছেলেকে মারধর করেন; কিন্তু তাতেও প্রতিশোধের নেশা কাটেনি মিজানুর কাজীর। বাবা ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
এদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর চাচাতো ভাই গুলিশাখালী ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি মো. রিফাত কাজীর সঙ্গে রিপন কাজীর আধিপত্য নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুইজনের মধ্যে চরম বিরোধ চলে আসছে। নিহতের ভাই সাব্বির কাজী অভিযোগ করেন, এ ঘটনাকে পুঁজি করে বাবা মিজানুর কাজী তার ভাইয়ের ছেলে সজিব কাজী, ছাত্রদল সভাপতি রিফাত কাজী ও তাদের সহযোগী রাসেল কাজী, রাহাত কাজী, সোহাগ কাজী ও মনির কাজীকে নিয়ে রিপন কাজীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টার দিকে রিপন কাজী ও তার চাচাতো ভাই রাজিব কাজী বাজারঘোনা এলাকা থেকে মোটরসাইকেলে গ্রামের বাড়ি কালিবাড়ী যাচ্ছিল। পথিমধ্যে পটুয়াখালী সদর উপজেলার গগণখা এলাকার ফারুক ডাক্তারের বাড়ির সামনে ওতপেতে থাকা বাবা মিজানুর কাজী, তার ভাইয়ের ছেলে রিফাত কাজী, রাসেল কাজী, সোহাগ কাজী ও মনির কাজীসহ ১৫-২০ জন রিপনের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। এ সময় ধারাল অস্ত্র দিয়ে রিপন কাজীকে হত্যা করা হয়েছে।
খবর পেয়ে আমতলী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মিজানুর কাজীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে। ওই ঘটনার পর থেকে বাবাসহ সন্ত্রাসীরা পালিয়েছে। স্থানীয়রা ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মোস্তফা কাজী ও ফিরোজ কাজী নামক দুইজনকে পালানোর সময় আটক করে আমতলী থানা পুলিশে সোপর্দ করেছেন। পুলিশ তাদের পটুয়াখালী সদর থানায় হস্তান্তর করেছে। তাদের ওই থানায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে জানান ওসি মো. মনিরুজ্জামান।
বাবার নেতৃত্বে ছেলেকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় পটুয়াখালী সদর থানায় মা আমেনা বেগম বাদী হয়ে মামলার প্রস্তুতি নিয়েছেন। লাশ পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী রাজিব কাজী বলেন, আমি আর রিপন কাজী রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাজারঘোনা থেকে বাড়ি যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে গগণখা নামক স্থানে পৌঁছামাত্রই রাসেল কাজী চাচাতো ভাই রিপন কাজীকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এতে মোটরসাইকেলসহ আমরা সড়কে লুটিয়ে পড়ি। আমি দৌড়ে খালে পড়লেও রিপন কাজীকে রিফাত কাজী, রাসেল কাজী, রাহাত কাজী, সোহাগ কাজী ও মনির কাজীসহ ১৫-২০ জন কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত রিপন কাজীর ছোট ভাই সাব্বির কাজী বলেন, আমার বাবা মিজানুর কাজী ১০টি বিয়ে করেছেন। ভাই রিপন কাজী এর প্রতিবাদ করলে তার সঙ্গে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। অপরদিকে আমার চাচাতো ভাই সজিব কাজীর পরিকল্পনায় বাবার নেতৃত্বে ও চাচাতো ভাই রিফাত কাজী ও তাদের সহযোগীরা আমার ভাইকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।
মা আমেনা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের কঠোর বিচার চাই। আমার স্বামীর ১০ বিয়েতে বাধা দেওয়ায় সন্তানকে খুন হতে হলো।
আমতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জালাল উদ্দীন ফকির বলেন, নিহত রিপন কাজি ইউনিয়ন শ্রমিক দল সভাপতি ছিলেন। তাকে এভাবে হত্যা করা হবে তা কল্পনায়ও ভাবিনি। এ ঘটনার বিচার চাই।
আমতলী থানার ওসি মো. ইয়াকুব হোসাইন বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় জনতা দুইজনকে আটক করে থানায় সোপর্দ করেছে। তাদের পটুয়াখালী থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা দুজন পটুয়াখালী পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে। ওই মোবাইল নিহত রিপন কাজীর বাবা মিজানুর কাজীর। ঘটনাস্থল পটুয়াখালী হওয়ায় তারাই আইনি ব্যবস্থা নেবে।
পটুয়াখালী সদর থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে
সজল আহমেদ
মন্তব্য করুন: