সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় দুর্নীতি প্রকাশ করায় সাংবাদিককে হুমকি
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি প্রণোদনার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অকৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং তথ্য সংগ্রহ করায় দৈনিক এদিন পত্রিকার মধ্যনগর উপজেলা প্রতিনিধি শিহাব মিয়াকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত সাদ্দাম হোসেন মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক বলে জানা গেছে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুন মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার ৮৯০ জন কৃষকের একটি সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র সমালোচনা ও আপত্তির ঝড় ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা কোনোদিন কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিলেন না। এছাড়া সচ্ছল ব্যক্তি এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামও তালিকায় স্থান পেয়েছে।
এরই প্রেক্ষিতে ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের প্রকৃত কৃষক ও সাধারণ মানুষ বিতর্কিত নামগুলো উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত আপত্তি জানান এবং প্রকৃত কৃষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলেন। আপত্তির মুখে উপজেলা প্রশাসন বিতর্কিত ও আপত্তিকৃত নামগুলোর বিপরীতে বরাদ্দ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে এবং অবশিষ্ট নামের বিপরীতে সহায়তা বিতরণ শুরু করে। একই সাথে আপত্তিকৃত নামগুলো পুনরায় মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাংবাদিক শিহাব মিয়া জানান, তিনি তার নিজ ওয়ার্ডের (১ নম্বর ওয়ার্ড) আপত্তিকৃত নামের তালিকায় যুবদল নেতা সাদ্দাম মিয়া ও তার পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি জানতে পারেন এবং সাধারণ কৃষকদের লিখিত আপত্তিতে এই অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাদ্দাম মিয়া তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকে সাংবাদিক শিহাবকে কল করে হুমকি দেন।
কল রেকর্ডের বরাত দিয়ে শিহাব মিয়া বলেন, সাদ্দাম মিয়া ফোনে তাকে অত্যন্ত হঠকারী ভাষায় বলেন, তোমার যদি এই গ্রামে থাকা লাগে, তবে এটা শেষ করা লাগবে। না হয় তোমার ঝামেলা হবে। গ্রামে থাকতে গেলে আমার সামনে পড়া লাগব। সামনে পড়লে পরে বুঝিস।
প্রকাশ্যে ও পরোক্ষভাবে ‘দেখে নেওয়ার’ এই হুমকিতে সাংবাদিক শিহাব মিয়া ও তার পরিবার বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত যুবদল নেতা সাদ্দাম মিয়া হুমকির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমি এলাকার মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ফোন করেছিলাম। কথোপকথনের সময় আবেগের বশে কিছু কথা বলে ফেলেছি। তাকে হুমকি দেওয়ার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। গ্রাম্য সম্পর্কে শিহাব আমার ভাতিজা, তাই অধিকারবশত তাকে এসব কথা বলেছি।
এদিকে ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে স্থানীয় দলীয় নেতৃত্ব। মধ্যনগর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম সইফুল বলেন, সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। সংগঠনের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দলীয় শৃঙ্খলা ও নীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় ঘোষ জানান, কৃষক তালিকা নিয়ে আপত্তির লিখিত আবেদন পাওয়ার পরপরই আমরা বিতর্কিত নামগুলো পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। কোনো অবস্থাতেই প্রকৃত কৃষকদের হক নষ্ট করতে দেওয়া হবে না।
সাংবাদিককে হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, তালিকায় আপত্তি জানানোকে কেন্দ্র করে কোনো সংবাদকর্মীকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রীতম দাস/ তানজুবা তাবাসসুম
মন্তব্য করুন: