প্রেমিকাকে কটূক্তির জেরে রণক্ষেত্র বাকৃবি, আহত ১৩
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীঘটিত ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে আশরাফুল হক হল ও শহীদ শামসুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গভীর রাত থেকে শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত দুই দফার সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
জানা গেছে, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের লেভেল ১, সেমিস্টার ২ এর দুই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগ রয়েছে, একই ব্যাচের এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে কটূক্তিকে কেন্দ্র করে দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে বৃহস্পতিবার রাত প্রায় আড়াইটার দিকে আশরাফুল হক হলের ৮ থেকে ১০ শিক্ষার্থী শহীদ শামসুল হক হলের এক শিক্ষার্থীর কক্ষে গিয়ে তাকে হুমকি দিয়ে আসেন। এরপরই দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক শিক্ষার্থী জানান, প্রথমে ফোনালাপের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। বরং সময়ের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে শহীদ শামসুল হক হলের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী লাঠিসোঁটা নিয়ে আশরাফুল হক হলে গিয়ে হামলা চালান। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, মূলত প্রেমসংক্রান্ত ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। এক শিক্ষার্থীর প্রেমিকাকে কটূক্তি করাকে কেন্দ্র করে প্রথমে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে তা উত্তেজনা ছড়িয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষে আশরাফুল হক হলের জানালার কাচ, সিসিটিভি ক্যামেরা ও বৈদ্যুতিক লাইট ভাঙচুর করা হয়। এতে অন্তত ৯ জন শিক্ষার্থী আহত হন। খবর পেয়ে রাত প্রায় ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তারা দুই হলের প্রভোস্টকে ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। রাতের সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও শুক্রবার আবারও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল জব্বার মোড় এলাকায় আশরাফুল হক হলের এক শিক্ষার্থীকে শহীদ শামসুল হক হলের ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী মারধর করেছেন বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনার জের ধরে প্রায় আধাঘণ্টা পর দুপুর আড়াইটার দিকে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়।
দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীরা ঘণ্টাব্যাপী ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়েন। এতে আব্দুল জব্বার মোড়সহ আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় আরও চারজন শিক্ষার্থী আহত হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ কেয়ার সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতের সংঘর্ষে আহত ৯ জন এবং শুক্রবার দুপুরের সংঘর্ষে আহত আরও ৪ জনসহ মোট ১৩ শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম বলেন, রাতে দুই হলে মারামারির খবর পেয়ে আমি ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। তখন দুই হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার জুমার নামাজের পর আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। একটি সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুব দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আহত শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসজুড়ে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করেছে। দুই আবাসিক হলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
রত্না বাউরী
মন্তব্য করুন: