মৌলভীবাজারে পাহাড় কেটে রিসোর্ট ব্যবসা

মৌলভীবাজারে পাহাড় কেটে রিসোর্ট ব্যবসা

নিজস্ব প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

২৭/০৯/২০২৬ ১২:১৮:১৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সবুজে ঘেরা চা-বাগান, পাহাড়, টিলা আর ঘন বনাঞ্চলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য নিয়ে মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন জেলা। তবে পর্যটন উন্নয়নের আড়ালে জেলাজুড়ে চলছে প্রকৃতি ধ্বংসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা। পাহাড় ও টিলা কেটে নামে-বেনামে গজিয়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ রিসোর্ট।

বন বিভাগের জমি দখল করে তৈরি করা এসব রিসোর্ট কারা করছে, এদের কোনো বৈধতা বা সরকারি অনুমতি আছে কি না তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যই নেই প্রশাসনের কোনো দপ্তরে। ফলে মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জসহ পুরো জেলাতেই এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। অভিযোগ রয়েছে, কোনো প্রকার আইনের তোয়াক্কা না করেই পাহাড়-টিলা কেটে কয়েকটি কক্ষ বানিয়েই নাম দেওয়া হচ্ছে ‘রিসোর্ট’।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে জেলাজুড়ে অন্তত ২০০টি রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলাতেই রয়েছে শতাধিক রিসোর্ট। যার মধ্যে রাধানগর এলাকায় নভেম ইকো রিসোর্ট, বালিশিরা রিসোর্ট, নিসর্গ ইকো-রিসোর্ট, শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্ট, মাধবীলতা ইকো কটেজসহ অন্তত ৪০টিরও বেশি রিসোর্ট রয়েছে। এসব রিসোর্ট টিলা কেটে ও পরিবেশ ধ্বংস করে তৈরি করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন জানে না কোনো তথ্য। অথচ স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলায় প্রায় ২০০টি রিসোর্ট থাকলেও প্রকৃত মানদণ্ড বজায় রেখে পরিচালিত হচ্ছে মাত্র ১৫-২০টি।

একই চিত্র দেখা গেছে কমলগঞ্জ উপজেলায়ও। সেখানেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা হয়েছে অর্ধশতাধিক অবৈধ রিসোর্ট-কটেজ। সরকারি খাস ও বন বিভাগের জমি দখল করে পাহাড় ও টিলা কেটে এ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের টিলাগাঁও এলাকায় টিলাগাঁও ইকো ভিলেজ ও আম্বার উড ইকো রিসোর্ট, পুরানবাড়ি এলাকায় বেকইয়ার্ড রিট্রেট, কারাঞ্জা স্পা রিসোর্ট, কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ছাতকছড়া এলাকায় সাউন্ড অব সাইলেন্স, সপ্নটিলা ইকো রিসোর্ট, বনগাঁও এলাকায় অরণ্য নিবাসসহ অর্ধশতাধিক রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

এসব রিসোর্টের মধ্যে কয়েকটির কাজ এখনো চলমান রয়েছে। এ ছাড়া শমশেরনগর এয়ারবেইজে সরকারি জায়গায় তৈরি করা হয়েছে ‘ছুটি’ নামে একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট। সেটি যৌথভাবে পরিচালনা করছে বিমান বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা ও ছুটি গ্রুপ। এ ছাড়া নুরজাহান সড়কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে নামে বেনামে গড়ে উঠছে অসংখ্য কটেজ-রিসোর্ট।

জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, বন বিভাগ ও সরকারি কর্মকর্তাদের অসাধু যোগসাজশে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় বড় কোম্পানি ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এসব রিসোর্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। এছাড়া অবৈধ এসব রিসোর্টের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আইনজীবী, ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা, ঢাকায় কর্মরত একাধিক সাংবাদিক ও সরকারি প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। রিসোর্ট ব্যবসায় ঝুঁকেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা, সেলিব্রেটিরাও।

মূলধারার কিছু রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, অনেকে স্থানীয়দের কাছ থেকে সামান্য ২-৩ শতক জায়গা কিনে কয়েকটি কক্ষ বানিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশতেই নেই কোনো সিসি ক্যামেরা, নৈশপ্রহরী বা নিরাপত্তাবেষ্টনী। মালিকরা নিজেরাই ম্যানেজার হয়ে গোপনে পরিচালনা করছেন সবকিছু, যার ফলে ভেতরে কী ঘটছে তা কারও জানা থাকে না।

ক্ষোভ প্রকাশ করে শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমদ বলেন, শ্রীমঙ্গলে প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলতে মাত্র ১০-১৫টি আছে। সরকারের নিয়ম মেনে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা কর দিয়ে যারা ব্যবসা করছে, তাদের ব্যবসা নামসর্বস্ব অবৈধ রিসোর্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পাহাড়-টিলা কেটে প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে রিসোর্ট বানানো হলেও সরকারের কোনো তদারকি নেই। অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা উচিত।’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান  বলেন, ‘কে রিসোর্ট করছে, কে অনুমতি দিচ্ছে এসব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরো চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতিমধ্যে একটা তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটা নীতিমালা করা দরকার। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম এদিনকে বলেন, ‘জেলায় ৬০টির মতো রিসোর্ট আমাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকিগুলোর অনুমোদন সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা নেই।’

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল  বলেন, জেলা প্রশাসন মূলত পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টগুলো দেখাশোনা করে। ছোটখাটো রিসোর্টগুলো অনুমোদন নিয়ে করছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা নেই।

রত্না বাউরী/প্রসি-২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad