শ্রীমঙ্গলে প্রকৃতির টানে এসে ফিরতে হয় ভোগান্তির অভিজ্ঞতা নিয়ে

শ্রীমঙ্গলে প্রকৃতির টানে এসে ফিরতে হয় ভোগান্তির অভিজ্ঞতা নিয়ে

নিজস্ব প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল

২৭/০৯/২০২৬ ১৫:০২:২৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সকালটা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। চা বাগানের সবুজের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল একটি পর্যটকবাহী গাড়ি। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে প্রকৃতির কাছে একটু প্রশান্তির খোঁজে ছুটে এসেছেন তারা। কারও হাতে ক্যামেরা, কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন চারপাশের সবুজ। সামনে পাহাড়, পাশে চা বাগান, দূরে বনের হাতছানি। সব মিলিয়ে চোখ জুড়ানো দৃশ্য।

কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় সেই মুগ্ধতার গল্প। গাড়ি পার্কিংয়ের নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। নেই বিশ্রামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। কোথায় যাবেন ও কীভাবে; অনেক জায়গায় নেই দিকনির্দেশনা। কোথাও আছে ময়লা-আবর্জনা, কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে অভিযোগ। আবার প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে দেখা মেলে প্রকৃতিকে ক্ষতবিক্ষত করে গড়ে ওঠা নানা স্থাপনার। এ যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে অব্যবস্থাপনার এক অদ্ভুত সহাবস্থান।

প্রকৃতির লীলাভূমি মৌলভীবাজার। সারি সারি চা বাগান; এশিয়ার অন্যতম রেইনফরেস্ট লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওর, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম ঝর্ণা, মাধবপুর লেক– পর্যটককে মুগ্ধ করার সবই আছে এখানে। জেলার সাত উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় শতাধিক পর্যটনকেন্দ্র। আছে অসংখ্য চা বাগান, রিসোর্ট এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি।

এই সম্ভাবনা সামনে রেখেই ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১৮ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বেসরকারি উদ্যোগে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা ব্যবসা গড়ে উঠলেও সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত ও দৃশ্যমান উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ঈদ, পূজা কিংবা সরকারি ছুটির দিনে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের ঢল নামে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। কেউ আসেন চায়ের বাগান দেখতে, কেউ লাউয়াছড়ার বন, কেউ আবার হামহাম কিংবা মাধবকুণ্ডের জলপ্রপাতের টানে। কিন্তু পর্যটক অনেকেরই অভিযোগ, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি তাদের পোহাতে হয় নানা বিড়ম্বনা।

যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপদ পার্কিং, পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যটকদের জন্য তথ্য-নির্দেশনার মতো মৌলিক সেবার ঘাটতি রয়েছে অনেক পর্যটনকেন্দ্রে। এর সঙ্গে রয়েছে খাবার, যানবাহন, হোটেল ও রিসোর্টের অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে অভিযোগ।

চা বাগান, টিলা, পাহাড় ও ফলের বাগান কেটে নানা বাহারি নামে গড়ে উঠছে হোটেল-রিসোর্ট। পরিবেশগত ভারসাম্য এবং এসব স্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবিদ ও পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা।

শ্রীমঙ্গল বালিশিরা ইকো রিসোর্টের ম্যানেজার ইয়াসির আরাফাত স্বপন বলেন, মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণা করা হয়েছে ১৮ বছর 

আগে। কিন্তু এই সময়ে পর্যটনবান্ধব সরকারি উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়েনি। ব্যক্তি পর্যায়ে বিনিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরকারি অবকাঠামো ও সহযোগিতা না থাকায় সেই বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, পর্যটন জেলা ঘোষণার পরও সরকারি উন্নয়নের প্রত্যাশিত ছোঁয়া লাগেনি। যা কিছু হয়েছে, তার বড় অংশই ব্যক্তি উদ্যোগে। শুধু বিনিয়োগ করলেই হবে না। পর্যটকদের বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ও পর্যটনকেন্দ্রের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। পর্যটনকে একটি শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে সুমনের মতে, পর্যটকদের স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে হলে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনাতেও শৃঙ্খলা আনতে হবে। তাঁর মতে, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, পার্কিং, স্যানিটেশন ও দিকনির্দেশনার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যটন মৌসুমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পর্যটক সন্তুষ্ট না হলে দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পর্যটন এলাকায় সেবার মান নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে বলে জানিয়েছেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। তিনি বলেন, টিলা-পাহাড় ও গাছপালা কেটে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্টসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর স্থাপনার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সেবার মান নিশ্চিতের বিষয়ও প্রশাসনের নজরে রয়েছে।

১৮ বছর আগে পর্যটন জেলা হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মৌলভীবাজার আজও পর্যটকদের টানে। প্রকৃতি তার সৌন্দর্য হারায়নি; চা বাগানের সবুজ ফুরিয়ে যায়নি; লাউয়াছড়ার বন পর্যটকদের ডাকছে; ঝর্ণার জলও ছুটে চলেছে আপন 

গতিতে। তারা এখন শুধু সুন্দর একটি জায়গা দেখতে চান না; চান নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সঠিক তথ্য, ন্যায্যমূল্য, নিরাপদ পার্কিং এবং স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ।

রত্না বাউরী/প্রসি-২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad