বড়লেখায় মাল্টা-কমলা চাষে তরুণ উদ্যোক্তার বাজিমাত

বড়লেখায় মাল্টা-কমলা চাষে তরুণ উদ্যোক্তার বাজিমাত

নিজস্ব প্রতিনিধি, বড়লেখা

৩০/০৯/২০২৬ ১২:৩৩:৩৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

একে একে সব ব্যবসায় লোকসান, চারপাশের মানুষের বাঁকা চোখ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎষ্ণসব মিলিয়ে একসময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল  মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ গ্রামের তররুণ উদ্যোক্তা রাজু আহমদের। কিন্তু হার না মানা অদম্য এই তররুণ থমকে যাননি।

নিরাশাকে পেছনে ফেলে হাত বাড়িয়েছিলেন জন্মভূমির উর্বর মাটির দিকে। যে পাহাড়ি টিলায় একদিন জন্মাত কেবল অনাবাদী ঝোপঝাড়, সেখানে আজ রাজুর ঘামে থোকায় থোকায় ঝুলছে সোনালী-সবুজ রসালো পাহাড়ি মাল্টা। রাজুর এই জাদুকরী ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এখন আর একজনের নয়; এটি রূপ নিয়েছে পুরো উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতির এক নীরব বিপ্লবে। 

কৃষি বিভাগের পরামর্শে মাত্র এক একর জমিতে ৯০টি চারাগাছ আর বুকভরা সাহস নিয়ে যখন রাজু নতুন যাত্রা শুররু করেন, তখন স্বজনদের চোখেও ছিল চরম সংশয়। শুররুতে দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করা বাগানে দিনরাত পরিচর্যার পর আসে প্রথম সাফল্যষ্ণমাত্র ১-২ বছরের মাথায় বিক্রি করেন ৫  থেকে ৬ লাখ টাকার ফল। আজ তার বাগানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কমলা ও মাল্টার ৭০০টিরও বেশি ফলদ বৃক্ষ। চলতি মৌসুমে শুধুমাত্র মাল্টা বিক্রি করেই ৫ কোটি টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন তিনি। অর্জিত আয় দিয়ে রাজু গড়েছেন স্বপ্নের বাড়ি এবং স্থাপন করেছেন আধুনিক  জৈব সার উৎপাদন ইউনিট (ভার্মি কম্পোস্ট)। 

স্থানীয়রা জানান, অতীতে বড়লেখার মানুষ কেবল বাড়ির আঙিনায় শখের বশে দু-একটি মাল্টার গাছ লাগাত। কিন্তু পাহাড়ি এসিডিক মাটি আর সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার সুবাদে এ অঞ্চলের ‘বারি মাল্টা-১’ বিদেশে আমদানিকৃত মাল্টার চেয়েও রসালো ও মিষ্টি হয়ে উঠছে। চাষিরা জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে বড়লেখার পাহাড়জুড়ে মাল্টার এমন বাম্পার ফলন হয়েছে যে, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিষমুক্ত ও সতেজ হওযায় বাজারে এর চাহিদা তুঙ্গে, যা পুরো দেশের বাজারে বিদেশি ফল নির্ভরতা কমানোর এক বিশাল বার্তা দিচ্ছে। 

বড়লেখা উপজেলার শুকনো মৌসুমে পানির সংকট দূর করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গ্রহণ করেছে বিশেষ উদ্যোগ। রাজু আহমদের মতো উদ্যোক্তাদের দেওয়া হয়েছে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ (বিন্দু সেচ) প্রযুক্তি, উন্নত চারা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও বালাই ব্যবস্থাপনার নানা উপকরণ। 

সফল উদ্যোক্তা রাজু আহমদ তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এক সময় নানা ব্যবসা করে ব্যর্থ হয়েছিলাম, সবাই নিররুৎসাহিত করত। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। এই বাগান আমাকে কেবল আর্থিক স্বচ্ছলতাই দেয়নি, দিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও মাথা উঁচু করে বাঁচার শক্তি। বেকার যুবকদের বলব, বিদেশে পাড়ি না জমিয়ে দেশের মাটিতেই লেগে থাকুন, সঠিক দিকনির্দেশনা ও অধ্যবসায় থাকলে সফলতা আসবেই। পাহাড়ের বুক চিরে রাজু আহমদের গড়ে তোলা এই সবুজ বাগান প্রমাণ করেষ্ণউপযুক্ত প্রযুক্তি, সরকারি দিকনির্দেশনা আর অদম্য মানসিকতা থাকলে দেশের মাটিতেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। বড়লেখার গাছে গাছে ঝুলতে থাকা রসালো এই মাল্টা  কেবল একটি ফল নয়, এটি বেকারত্ব দূর করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের এক নতুন আলোকবর্তিকা।

বড়লেখা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, রাজু আহমদ একজন পরিশ্রমী ও উদীয়মান উদ্যোক্তা। কৃষি অফিস থেকে তাকে মাল্টা-১ জাতের বাগান তৈরিতে চারা, ড্রিপ ইরিগেশন ও ভার্মি কম্পোস্টসহ সর্বাত্মক প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তার এই সাফল্য বড়লেখার অন্য তররুণদের জন্য একটি চমৎকার অনুপ্রেরণা। আগ্রহী যে কাউকেই আমরা এভাবে সহযোগিতা করতে পপ্রস্তুত।  

তিনি আরও বলেন, রাজু আহমদের এই গল্প প্রমাণ করে সঠিক দিকনির্দেশনা, অধ্যবসায় এবং পরিকল্পিত পরিশ্রম থাকলে কৃষির হাত ধরেই গড়ে তোলা সম্ভব একটি ঠেকসই ও সফল ভবিষ্যৎ। রাজুর এই সাফল্য অন্য তররুণদের জন্য এক চমৎকার অনুপ্রেরণা।

রত্না বাউরী/প্রসি-২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad