প্রসঙ্গ- সিলেট-৪ আসনে জামানের মনোনয়ন দাবি এবং প্রতিক্রিয়া
সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছেন অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান। গেল ১০ অক্টোবর তিনি হযরত শাহজালাল (র.) এর দরগাহ মসজিদে পবিত্র জুম্মাহর নামাজ আদায় শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতির কথা জানান। জামানের এমন মন্তব্যের পর থেকে বিভিন্ন মহলে শুরু হয় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে ব্যক্তিগত সফর শেষে তিনি জৈন্তাপুর,গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী গণ সংযোগ শুরু করেন। প্রতিটি গণসংযোগে বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ জামান অনুসারীদের উপস্থিতি বেশ লক্ষনীয়।
কে এই জামান
শুরুতেই বলে রাখতে চাই, শামসুজ্জামান জামান সিলেটের রাজনীতিতে এক আলোচিত নাম। জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করে যার ছাত্র রাজনীতির শুরু। ৮ এর দশকে ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ জামানের । ৯’ এর দশকে এই নাম সিলেটের ছাত্র রাজনীতিতে খুবই তুঙ্গে। সেই সময় থেকে জামান অনুসারীদের নিয়ে তৈরি হয় জামান গ্রুপ। বলা হয় সিলেটে গ্রুপ কেন্দ্রীক রাজনীতি তখন থেকেই শুরু। সে সময়টাতে জামানের নামে অনেকের শরীরে সৃষ্টি হতো ভূ-কম্পন। উতাল-পাতাল ঢেউ বয়ে যেত সর্বত্র। মিছিল,মিটিং, সংগ্রাম,দুর্যোগ আর দলীয় সঙ্কটে তিনি ছিলেন ‘সবেধন নিলমনি’। ছাত্রদলের রাজনীতিতে সফলতার জের ধরে যুক্ত হন স্বেচ্ছাসেবক দলে। সিলেটে স্বেচ্ছাসেবক দল জামানের হাত ধরেই সুপ্রতিষ্টিত হয়। দলীয় পরীক্ষায় বারবারই প্রথম গ্রেড প্রাপ্ত জামান পরবর্তীতে যোগ দেন অভিভাবক সংগঠনে। দলে দায়িত্বশীল পদ পেলেও জামানের অনুসারীরা তাতে সন্তোষ্ট হতে পারে নি। সে সময় পদ থেকে অব্যাহতি নিলেও দলীয় নেতা হিসেবে দলীয় সকল কর্মসূচীতে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
রাজনীতি বিষয়ে পড়াশোনার আগ্রহ ছাত্রজীবন থেকেই। ফলে বইপোকা মানুষটি দেশিয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কেও ধারণা রাখেন অনেকের কল্পনাতীত। দেশি-বিদেশী জার্নালে নিত্য রাজনৈতিক খবর সংগ্রহ ও পাঠ করা এখনও তাঁর দৈনন্দিন রুটিন। রাজনীতির পাঠ তাঁর নিজের রাজনীতিকে করেছে আরো ঋদ্ধ ও কর্তব্যনিষ্ট। কিন্তু সেই কর্তব্যের ডাক কখনো থেমে যায়। থামিয়ে দেওয়া হয়। তখনই রাজনীতির প্রতি সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড ক্ষোভ, অভিমান। ক্রিয়াহীন মানুষের মান-অভিমান কিংবা রাগ-অনুরাগ থাকে না। থাকার কথাও নয়। কিন্তু পথচলা পথিককে থামি্য়ে দিলে যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। জামানকেও থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। থামানোর যাত্রা শুরু হয় সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন দিয়ে। যার হাত ধরে সিলেটে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে পরিচিত পাওয়া স্বেচ্ছাসেবক দল, সেই কমিটি থেকেই অদৃশ্য ইঙ্গিতে বাদ দেওয়া হওয়া হয় তাঁর অনুসারীদের। তিনি বিষয়টি কেন্দ্রকে জানান। অবশেষে ২০২১ সালের ১৮ আগষ্ট শামসুজ্জামান জামান মীরাবাজারস্থ নিজ অফিসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দল থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
যেভাবে প্রতিক্রিয়ার শুরু
আগেই বলেছি চলতি মাসের ১০ অক্টোবর তিনি দরগায়ে হযরত শাহজালাল (র.) এর দরগাহ মসজিদে নিজের নেতাকর্মীদের নিয়ে পবিত্র জুম্মা’র নামাজ আদায় শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে কথা বলেন। সে সময় তিনি সিলেট-৪ আসন থেকে জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যে আসন থেকে তিনি ২০১৮ সালেও নির্বাচনের জন্য দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দলের সিনিয়র নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম মনোনয়ন চাইলে দলীয় নির্দেশে তিনি প্রার্থীতা থেকে বিরত থাকেন।
জনাব জামানের এই ঘোষণার পর অনেকেই বলতে শুরু করেছেন- সিলেট-৪ আসনে এবার কোনো বহিরাগতকে মেনে নেওয়া হবে না। কেউ বলছেন, দলত্যা্গীদের দলে ফেরাবে না বিএনপি। আবার অনেকে বলার চেষ্টা করেছেন, জামানকে দলে ফেরানো হলে সিলেট ফের অশান্ত হয়ে উঠবে। এই সবগুলো হচ্ছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তার বিপরীতে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া কী নেই ? আসলে জামানের এই ঘোষণার পর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও বেশ লক্ষ করা গেছে। কেউ বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয়তাবাদী দলে জামান এখন অনিবার্য একটি শক্তি। কারণে একমাত্র জামানেরই রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ বৃহত নেতাকর্মী। কেউ বলছেন, গেল চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে সদলবলে জামান বাহিনীর ফ্যাসিস্ট বিরোধী অবস্তান উল্লেখযোগ্য একটি ভূমিকা রাখে। যে কারণে নিজ দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন সরাসরি ফ্যাসিস্ট বিরোধী অবস্তানে রাষ্ট্রযন্ত্রসহ লীগ বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। এই আন্দোলনে শামসুজ্জামান জামান কিন্তু নিজেও রক্তাক্ত হয়েছেন। মূলত এই ছিল ইতিবাচক আলোচনা।
কেন এই আলোচনা
২০২১ সালের ১৮ আগষ্ট শামসুজ্জামান জামান মীরাবাজারস্থ নিজ অফিসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দল থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘দল থেকে বিদায় নিয়েছি- এর মানে এই নয়,যে আমি অন্য কোনো দলে যোগদান করবো। তবে দলীয় পরিচয় বিহীন দলের আদর্শ ধারণ করেই হবে থাকবে আমার আগামীর পথ চলা’। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যে জামান ঘোষণা দিয়ে নিজ দলের রাজনীতি থেকে অবসর নিলেন, তিনি কেন আবার দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করতে চাইছেন? প্রশ্নটি কিন্তু একেবারেই প্রাসঙ্গিক এবং কোন ভাবেই এটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যে বিষয়টি আলোচনায় প্রাসঙ্গিক
রাজনীতি একটি পেশা নয়, এটি মূলত সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দায়িত্ব ও আদর্শিক প্রতিশ্রুতি। একজন ব্যক্তি রাজনীতিতে যুক্ত হন সমাজ পরিবর্তন, উন্নয়ন, কিংবা নিজের রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। সেই প্রেক্ষাপটে, কেউ যদি কোনো সময় রাজনীতি থেকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে অবসর নেন — তা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, স্বাস্থ্যগত বা নানাবিধ কারণে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: যদি তিনি পরবর্তীতে আবার নিজের দলেই ফিরে আসেন, তাতে দোষের কী আছে? প্রথমত, রাজনীতি করা বা না করা—এটি একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত ও সাংবিধানিক অধিকার। যেমন একজন রাজনীতিবিদ অবসর নিতে পারেন, তেমনি নিজের ইচ্ছায় পুনরায় সক্রিয় হতে পারেন। যদি তিনি অন্য কোনো দলে যোগ না দেন এবং আগের দলের আদর্শে অনুগত থাকেন, তবে তাঁর ফিরে আসায় নৈতিক বা সাংগঠনিক কোনো দোষ খোঁজা যায় না। সত্যি কথা হলো- রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন রাজনীতির ভেতর থেকে কাজ করলে তিনি দলীয় সংগঠন, জনমানস, ও প্রশাসনিক বিষয় সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর মতো অভিজ্ঞ নেতার ফিরে আসা দলের জন্য বরং একটি ইতিবাচক দিক—কারণ এতে দল অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন উদ্যম পায়।
আবেগতাড়িত অবস্থা কিংবা রাগ-অনুরাগ বা মান-অভিমান নিয়ে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যে কেউ দল থেকে “অবসর” ঘোষণা করতে পারেন। কিন্তু সেই লোক ফের দলে ফিরতে চাইলে এতো সমালোচনা কতোটুকু গ্রহণযোগ্য ? তিনি কী দল থেকে কিন্তু বহিস্কৃত ? তিনি দলের জন্য কখনো বিপদের কারণ ছিলেন? এর উত্তর যদি না হয়, তবে জামান দলে ফিরে দলীয় মনোনয়ন চাইলে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবার মতো কোন ঘটনা হবে না। তাছাড়া, দল করতে গিয়ে জামানের উপর রয়েছে প্রায় ৪০ টির মতো মামলা। তাহলে দল যদি এই বিষয়টি মূল্য দিয়ে জামানকে মনোনয়ন দিয়ে দেয় কিংবা জামান মনোনয়ন চেয়ে থাকেন, তার কোনটাতেই রাজনৈতিক ছন্দপতন ঘটার কোন সুযোগ নেই। হ্যা প্রশ্ন উঠেছে- সিলেট-৪ আসনে তিনি বহিরাগত। তাহলে এর অর্থ দাঁড়ালো নিজ আসনের বাহিরে কারো জন্ম হলে তাকে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই কথাটি বাংলাদেশের কোন আইনে লেখা রয়েছে। দেশের সবকটি নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে- দলের প্রয়োজনে জনপ্রিয় লোকদের নিজ আসনের বাহিরে মনোনয়ন দিয়ে সদস্য নির্বাচিত করা হয়েছে। সিলেটেও একাধিক প্রমান রয়েছে। সাইফুর রহমান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ আরও অনেকের নাম এভাবে বলা যেতে পারে। তাহলে সেটিও যখন বেআইনী কিংবা অগ্রহণযোগ্য,অতএব তিনি নির্বাচন করার অধিকার অবশ্যই সংরক্ষন করেন।
আমরা জানি পরিবার বা সমাজের উৎসাহে,অথবা দলের প্রয়োজনে —একজন রাজনীতিক পুনরায় সক্রিয় হতে পারেন। এতে কোনো অনৈতিকতা নেই, বরং দায়িত্ববোধ প্রকাশ পায়। তবে দল যদি তাঁকে পুনরায় গ্রহণ করে এবং তিনি দলের নীতি-আদর্শ মেনে চলেন, তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ বৈধ ও গ্রহণযোগ্য। দোষ তখনই হয়, যখন কেউ দলত্যাগ বা দলবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন। কিন্তু যদি আন্তরিকতা ও আদর্শে স্থির থেকে তিনি ফিরে আসেন, সেটি দলের ঐক্য ও শক্তি বৃদ্ধি করে। জনগণের চোখে নেতার মূল্যায়ন নির্ভর করে তাঁর কর্ম ও সততার ওপর। যদি মানুষ মনে করে যে তিনি দলের কল্যাণে ফিরে এসেছেন, স্বার্থের জন্য নয়—তাহলে তাঁর প্রত্যাবর্তন ইতিবাচকভাবেই দেখা হবে।
সুতরাং, একজন রাজনীতিবিদ যে কোনো কারণে রাজনীতি থেকে অবসর নিতে পারেন। কিন্তু পরবর্তীতে যদি তিনি নিজ দলের রাজনীতিতে পুনরায় যুক্ত হন, তাতে দোষ নেই—বরং তা হতে পারে দলের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের পুনর্নবীকরণ। রাজনীতি আদর্শের জায়গা, আর আদর্শে ফিরে আসা কখনোই অপরাধ নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, যেহেতু শামসুজ্জামান জামান রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে অন্য কোনও দলে যোগ দেন নি, কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কোন অভিযোগ ছিল না এমনকি দলীয় রাজনীতির কারণে যার কাঁধে ৪০ টি উপরে মামলা. সেই মানুষের নিজ দলে ফিরে আসা কিংবা আকুতি আশ্চর্য্য হবার মতো কিছু নয়। এ নিয়ে অহেতুক জল ঘোলা যারা করতে চায়-তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠতে পারে।
তাহির আহমদ
মন্তব্য করুন: