হাওরে কান্নার রোল: পচে যাচ্ছে ধান, তলিয়ে গেছে লাখো কৃষকের স্বপ্ন
হাওরাঞ্চলে দিগন্তজোড়া সোনালি ধানের মৌসুমে এখন বইছে কেবলই হাহাকার। আনন্দ আর উৎসবের বদলে ফসলের মাঠে এখন শুধুই সর্বনাশের ছবি। টানা ভারী বর্ষণ, বজ্রপাত আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে একের পর এক বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে লাখো কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল। সুনামগঞ্জ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারসহ গোটা হাওরাঞ্চলে এখন শুধুই কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।
সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে গতকাল মঙ্গলবার দেখা গেছে এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য। বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাঁচা-পাকা ধান কেটে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা। মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের কৃষক আলাউদ্দিন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, "অর্ধেক ধান কাটলেও বৃষ্টির কারণে তা খলায় পচে যাচ্ছে, বাকি জমি পানির নিচে।" একই হাওরপারের আব্দুস ছাত্তার জানান, মাথার ওপর বজ্রপাতের প্রচণ্ড গর্জন আর ঝোড়ো হাওয়া থাকলেও পেটের তাগিদে কেউ হাওর ছাড়ছেন না। অন্যদিকে নলুয়ার হাওরে সোমবার রাতভর বৃষ্টির পর মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃষকরা দেখেন তাঁদের সব ফসল পানির নিচে। দাসনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদাচরণ দাসের মতো হাজারো ক্ষুদ্র কৃষক এখন পথে বসার উপক্রম।
সমস্যা কেবল ধান তলিয়ে যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা কেটে আনা ধান শুকাতে পারছেন না। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে ধর্মপাশার ধারাম হাওরে চাষ করতে আসা কৃষক আলাল মিয়া জানান, অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করা ৩০ মণ ধানে বস্তার ভেতরেই চারা গজিয়ে গেছে। রোদ না থাকায় খলায় রাখা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার জামগড়া খালের বাঁধ ভেঙে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ইয়ারন বিলের পাকা ধান। শ্রমিক সংকট আর যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে না পারায় ফসলের এই ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, ছোট ছোট শিশুদেরও এখন বাবার সঙ্গে ধান কাটতে হাওরে নামতে হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে সুনামগঞ্জে দুই দিনে ৫০৫ হেক্টর এবং কিশোরগঞ্জে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমি ডুবে যাওয়ার কথা বলা হলেও স্থানীয়দের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও মৌলভীবাজারেও হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি এখন পানির নিচে। এরই মধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টিপাতের এই প্রবণতা আরও অন্তত এক সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল থাকায় এবং বৃষ্টির পূর্বাভাস অব্যাহত থাকায় হাওরবাসীর শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ফসল হারিয়ে আসন্ন দিনগুলো কীভাবে কাটবে, সেই চিন্তায় এখন দিশেহারা হাওরপারের মানুষ।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: