নির্বাচন ঘিরে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, বালুমহাল ইজারা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের দাবি
সুনামগঞ্জে ডিসিসহ প্রশাসনের কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইসিতে অভিযোগ
সুনামগঞ্জের জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন পরিবেশকর্মী খোরশেদ আলম। অভিযোগের তালিকায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. ইলিয়াস মিয়া, তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম শান্তনুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী খোরশেদ আলম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি বর্তমান জেলা প্রশাসক ও তাঁর নেতৃত্বাধীন জেলা-উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, তাহলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাঁর দাবি, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘন করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়েছেন এবং ‘ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন’ই তাদের প্রধান কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামি ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেলকে নাগালে পেয়েও পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়নি। বরং হাইকোর্টের রায় অমান্য করে এবং প্রচলিত বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে যাদুকাটা নদীর ২ নম্বর বালুমহাল তাঁর নামে ইজারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বালুমহাল ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিকভাবে হত্যা মামলার পলাতক আসামি শাহ রুবেলকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং ইজারা হস্তান্তর-সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল করা হয়েছে। থানা পুলিশের বিবৃতিতে শাহ রুবেলকে হত্যা মামলার পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তিনি কীভাবে সরকারি বালুমহালের ইজারা পেলেন এবং কেন তাঁকে জেনেশুনে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি—এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ইজারা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের ছত্রছায়ায় শাহ রুবেল ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, বালুমহালটি তাঁর কাছেই হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হস্তান্তরকালে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় ঘটনাস্থলে শাহ রুবেলের উপস্থিতি ছিল না। তাঁর পরিবর্তে নাসির মিয়া নামের এক ব্যক্তির কাছে বালুমহাল হস্তান্তর করা হয়, যার পক্ষে কোনো বৈধ নথি সংযুক্ত করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শাহ রুবেলকে আড়ালে নিরাপদে রাখতে সরকারি নথিতে তথ্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।
পরিবেশকর্মী খোরশেদ আলম আরও দাবি করেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) পর্যায়ে একাধিক বদলি হলেও সুনামগঞ্জের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ‘অদৃশ্য শক্তির ইশারায়’ বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ফলে তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করছেন—এমন গুঞ্জনও এলাকায় রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
খোরশেদ আলম বলেন, “এমন কর্মকর্তাদের দ্বারা বহুল আকাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনোভাবেই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
এদিকে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে বেপরোয়া বালু লুটপাটে জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা এবং অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে বালু সিন্ডিকেটকে সহায়তার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিকরা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়া বলেন, সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে শাহ রুবেল বালুমহালের ইজারা পেয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যা মামলার একজন এজাহারভুক্ত আসামি এক্ষেত্রে বিবেচ্য কিনা—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এখানে এসব নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।”
তিনি আরও প্রশ্ন তুলে বলেন, “রুবেল কি আপনাদের কাছে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে? যদি না জানিয়ে থাকে, তাহলে আপনাদের সমস্যা কী?”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: