সুনামগঞ্জের হাওরে স্থায়ী গোপাট ও থ্রেসিং ফ্লোর: কৃষিতে নতুন অধ্যায় শুরু
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দুর্গম হাওর থেকে উৎপাদিত বোরো ফসল দ্রুত ও নিরাপদে ঘরে তুলতে এবার প্রথমবারের মতো নির্মাণ করা হচ্ছে স্থায়ী গোপাট (ফসল পরিবহনের পথ), ধান মাড়াইয়ের ‘থ্রেসিং ফ্লোর’ এবং ধান শুকানোর ‘সানিং ফ্লোর’। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের আওতায় এই কার্যক্রম শুরু করেছে।
প্রকল্পটির আওতায় সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার পর সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের চার জেলায় কৃষিখাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে।
হাওরের প্রধান সমস্যা হলো উৎপাদিত ধান দ্রুত লোকালয়ে পৌঁছে দেওয়া। বর্ষার আগেই পাহাড়ি ঢল বা আগাম বন্যার কারণে কৃষকদের কর্দমাক্ত গোপাট ব্যবহার করতে হয়। এই কষ্ট লাঘবে প্রকল্পে ১০ কিলোমিটার গোপাট ৮ ফুট প্রশস্ত করে আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে পাকা করা হবে। প্রথম বছরে সুনামগঞ্জে ৪ কিলোমিটার গোপাট নির্মাণ হবে।
এছাড়া দুর্গম হাওরে যেখানে বৃষ্টির ভয়ে ধান মাড়াই করা যায় না, সেখানে বিশেষ ‘থ্রেসিং ফ্লোর’ এবং ধান শুকানোর জন্য ‘সানিং ফ্লোর’ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকলেও কৃষকরা দ্রুত ধান মাড়াই করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারবেন।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেট বিভাগের ১৭,০১৯ হেক্টর পতিত জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এতে বার্ষিক প্রায় ৫১,০৫৮ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। খালের পানি ব্যবস্থাপনা এবং পাহাড়ি নালা খননের মাধ্যমে এই সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
হাওর আন্দোলনের নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে হাওরের গোপাট পাকা করার দাবি জানিয়ে আসছিলাম। এর ফলে সড়ক ও নৌপথ উভয় মাধ্যমে ধান পরিবহন সহজ হবে। তবে পর্যায়ক্রমে জেলার সব গুরুত্বপূর্ণ হাওরে এই সুবিধা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।"
হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, "প্রকল্পটি যেন জলবায়ু সহিষ্ণু ও টেকসই হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। হাওরের বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবং দুর্নীতিমুক্তভাবে কাজ শেষ করলে কৃষকরা প্রকৃত সুফল পাবেন।"
প্রকল্প পরিচালক প্রণজিত কুমার দেব জানান, "এই প্রকল্প হাওরের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। জরুরি পরিস্থিতিতেও গোপাট ও থ্রেসিং ফ্লোর কৃষকদের জন্য আর্শীবাদ হয়ে দাঁড়াবে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং তারা ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারবেন।"
বর্তমানে প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে এবং চলতি অর্থবছর থেকেই দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: