সুনামগঞ্জে সংসদ নির্বাচনে সরব প্রার্থীরা, গণভোটে নীরবতা; ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের মতো হাওরবেষ্টিত সীমান্তবর্তী জেলা সুনামগঞ্জেও বইছে নির্বাচনি হাওয়া। প্রার্থীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংসদ নির্বাচনে ভোট চাইলেও গণভোট নিয়ে বেশিরভাগ প্রার্থীই রয়েছেন নীরব। ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি।
সরেজমিনে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচটি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ জেলার প্রতিটি আসনেই প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। উঠান বৈঠক, পথসভা ও গণসংযোগে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, হাওর রক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নানা প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও গণভোটের উদ্দেশ্য, গুরুত্ব কিংবা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের তাৎপর্য নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না অধিকাংশ প্রার্থী।
ভোটারদের অনেকেই জানেন না—গণভোটে কী বিষয়ে মতামত দিতে হবে, একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট রাষ্ট্র পরিচালনায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে কিংবা জুলাই সনদের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী। তবে এই নীরবতার মধ্যেও ব্যতিক্রম হিসেবে মাঠে সরব দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীদের। জেলার কয়েকটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
সচেতন নাগরিকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। এখন সেই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গণভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী আনিসুল হক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভোটের মাঠে কাজ করছি। হাওরে হাওরে ধানের শীষের গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। গণভোটের পক্ষেও হাওরে গণজোয়ার তুলব ইনশাআল্লাহ।”
সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “আমরা গণভোটের পক্ষে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই। এখনও গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইনি, তবে ২০ তারিখের পর ধানের শীষের পাশাপাশি গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইব।”
একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রত্যাশা হলো গণভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে দেশে শত বছরেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই দাঁড়িপাল্লার ভোটের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার করছি।”
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ইয়াসীন খাঁন বলেন, “দেশে যেন বারবার ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে, সে জন্যই গণভোটের আয়োজন। আমি নির্বাচনি প্রচারে দাঁড়িপাল্লার পাশাপাশি গণভোটের পক্ষে সরব।”
একই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, “১৭ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া এই অর্জন টেকসই হবে না। এজন্য গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছি।”
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম বলেন, “আমি নিজেও একজন জুলাইযোদ্ধা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আবারও ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে। ঈগল মার্কার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইছি।”
সুনামগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন, “ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে গণভোটের বিকল্প নেই। ধানের শীষের পাশাপাশি গণভোটের পক্ষেও মাঠে কাজ করব।”
একই আসনের জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শামস উদ্দিন বলেন, “নির্বাচনি প্রচারণার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার পক্ষে ভোট চাইছি। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের একইভাবে মাঠে নামা উচিত।”
জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, “ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন ও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়তে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে শক্ত জনমত গঠন জরুরি।”
সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একইদিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অথচ গণভোট বিষয়ে ভোটারদের সচেতন করার উদ্যোগ এখনো চোখে পড়ছে না। ব্যাপক প্রচার না হলে গণভোটের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।”
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিজাম উদ্দিন বলেন, “প্রার্থীদের শুধু নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালালেই চলবে না। গণভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট রাষ্ট্র পরিচালনায় কী প্রভাব ফেলবে—তা সহজ ভাষায় জনগণের সামনে তুলে ধরা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: