হাওরে পানি কম, ক্লোজারও কম—তবু বরাদ্দ বেড়েছে কোটি কোটি টাকা
Led Bottom Ad

মনগড়া প্রাক্কলনে ফসলরক্ষা বাঁধে লুটপাটের অভিযোগ

হাওরে পানি কম, ক্লোজারও কম—তবু বরাদ্দ বেড়েছে কোটি কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১৮/০১/২০২৬ ১১:৫৬:৩২

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে গেল বর্ষা মৌসুমে তুলনামূলকভাবে পানি স্বল্পতা ছিল। পানি কম থাকায় অনেক ফসলরক্ষা বাঁধ অক্ষত রয়েছে এবং বিগত বছরের তুলনায় সম্ভাব্য বড় ভাঙন বা ‘ক্লোজার’ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অথচ বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতি রেখে মনগড়া জরিপ ও যেনতেন প্রাক্কলনের মাধ্যমে বাঁধ সংস্কারে বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকারি অর্থ লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন হাওর সচেতন মানুষ ও কৃষকরা।

সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন উপজেলার অর্ধশতাধিক হাওরের প্রকল্প এলাকা ঘুরে এসব অভিযোগের মিল পাওয়া গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরের এক সময়ের বিপজ্জনক ক্লোজার এলাকা লালুরগোয়ালা এখন কার্যত সড়ক সদৃশ রূপ নিয়েছে। একই হাওরের নান্টুখালি বাঁধ ও স্লুইচগেট সংলগ্ন এলাকা, যেখানে গত বছর বড় ভাঙন হয়েছিল, সেখানে এবার বাঁধ পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে। দু’এক স্থানে ছোটখাটো ভাঙন দেখা গেলেও তা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম।

জামালগঞ্জ উপজেলার হালি হাওরেও একই চিত্র দেখা গেছে। গেল মৌসুমের বদরপুর–হাওড়িয়া আলীপুর মধ্যবর্তী ঘনিয়ার কাড়া অংশের বিপজ্জনক ক্লোজারটি এ বছর আর নেই। রাজধরপুর থেকে রামজীবনপুর, পৈন্ডুব, মামুদপুর, দুর্গাপুর ও মদনাকান্দি পর্যন্ত দীর্ঘ বাঁধে বড় ধরনের কোনো ভাঙন দেখা যায়নি। আছানপুর, হরিপুর, সুন্দরপুর হয়ে উলুকান্দি-যতীন্দ্রপুর এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার বাঁধও অক্ষত রয়েছে। কেবল নেতুয়ার কাড়া এলাকায় ছোট একটি ভাঙনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

একইভাবে মহালিয়া হাওরের গত বছরের বড় ভাঙন অংশ (হিজলা গ্রামের পূর্ব দিকে) এবার অক্ষত রয়েছে। ধর্মপাশার সোনামড়ল হাওর, দিরাই ও শাল্লার বরাম হাওর এবং ছায়ার হাওরের সম্ভাব্য বাঁধ এলাকাতেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় বাড়তি বরাদ্দের চিত্র পাওয়া গেছে।

শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরপাড়ের এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গত বছর ১২ লাখ টাকার প্রকল্পে এবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৩ লাখ টাকা। অনেক প্রকল্পেই এভাবে দ্বিগুণ বরাদ্দ বেড়েছে। এই টাকা কৃষকের স্বার্থে নয়, লুটপাটের জন্য।”

তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭২৭টি প্রকল্পে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২১ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রকল্প সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭৬টিতে দাঁড়ায় এবং বরাদ্দ হয় ২০৫ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৩৪টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১৩০ কোটি টাকা।

গত বছর (২০২৪-২৫) ১২ উপজেলার ৫৩টি হাওরে ৬৮৭টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ১২৭ কোটি টাকা। চলতি বছর অনেক বাঁধ অক্ষত ও ক্লোজার কম থাকার পরও বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৪ কোটি টাকা—অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় ১৭ কোটি টাকা বেশি।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, চলতি বছর ১২ উপজেলার ৭০৩টি প্রকল্পে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দিরাই উপজেলায় ১৩০টি প্রকল্পে সর্বোচ্চ ২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং শাল্লা উপজেলায় ১২৬টি প্রকল্পে ২৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রায় সব উপজেলাতেই বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে।

জামালগঞ্জের মহালিয়া হাওরের গতবারের এক প্রকল্প সভাপতি বলেন, “গত বছর এখানে ক্লোজার ছিল, এবার নেই। বরাদ্দ অবশ্যই বেশি। এখানে পার্সেন্টিজের বিষয় আছে।”

শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সোহেল তালুকদার বলেন, “বেশির ভাগ বাঁধ অক্ষত, ক্লোজারও কম। তবু দুই থেকে তিন গুণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটা পুরোনো লুটপাটের ধারাবাহিকতা ছাড়া কিছু নয়।”

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ বলেন, “বরাদ্দ বাড়ার দায় পাউবো ও মাঠ প্রশাসন একে অপরের ওপর চাপাচ্ছে। এখন রাজনৈতিক চাপ না থাকলেও বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে সরকারি অর্থ অপচয় কার স্বার্থে?”

বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি সুনামগঞ্জ জেলার সহ-সভাপতি খায়রুল বশর ঠাকুর খান বলেন, “মাটি অক্ষত থাকলে বরাদ্দ কমার কথা। বরাদ্দ বাড়ানো মানেই লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা।”

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা কাবিটা মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, “বাঁধে বরাদ্দ বেশি মনে হলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী সভায় এটি উত্থাপন করা হবে।”

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad