শাল্লায় হাওর রক্ষা বাঁধে নজিরবিহীন অনিয়ম: ২৯ কোটি টাকা লোপাটের শঙ্কা
সুনামগঞ্জের অবহেলিত ও দুর্গম উপজেলা শাল্লায় বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজের অগ্রগতি ৩০ শতাংশ দাবি করা হলেও সরেজমিনে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনে স্বজনপ্রীতি এবং বারবার রদবদলের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে হাজার হাজার কৃষকের স্বপ্নের বোরো ফসল।
শাল্লার গুরুত্বপূর্ণ উদগলবিল, ভাণ্ডাবিল ও ছায়ার হাওর ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাঁধে এখনো মাটির কাজ শুরুই হয়নি। অথচ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি পিয়াস চন্দ্র দাস দাবি করছেন, ইতিমধ্যে ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, প্রশাসনের এই তথ্য কেবল ‘আইওয়াশ’। অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র ঘাস পরিষ্কার বা সামান্য মাটি ফেলেই বিশাল অগ্রগতি দেখানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শাল্লায় ১২৭টি প্রকল্পের বিপরীতে প্রথমে ১৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও রহস্যজনকভাবে তা বাড়িয়ে ২৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। কাজের মান না বাড়িয়ে কেন বরাদ্দ দ্বিগুণেরও বেশি করা হলো, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
- ৭১নং পিআইসি: কাজ শুরু হলেও রহস্যজনক কারণে উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটি কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
- ১১৬নং পিআইসি: প্রভাবশালী চক্রের বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার কারণে এখানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
- ১১৭ ও ১১৮নং পিআইসি: কোনো সাইনবোর্ড বা কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পিআইসির সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, পাউবোর সেকশন অফিসার (এসও) তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন না।
অভিযোগ উঠেছে যে ৮৮, ১০৬, ১০৯ ও ১১২ নম্বর পিআইসিসহ অসংখ্য কমিটির সদস্যদের সংশ্লিষ্ট বাঁধে কোনো জমি নেই। কাবিটা নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী, বাঁধের পাশে জমি থাকা প্রকৃত কৃষকদেরই পিআইসিতে রাখার কথা থাকলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিন্ডিকেট ভূমিহীন বা শহরবাসীদের দিয়ে কমিটি গঠন করেছে।
শাল্লা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) ওবায়দুল হক বলেন, “মাঠ পর্যায়ে তদারকি চলছে। স্থানীয় কিছু দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক রদবদলের কারণে কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। আমরা দ্রুততম সময়ে কারিগরি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।”
ইউএনও পিয়াস চন্দ্র দাস ১২৭টি পিআইসি অনুমোদনের কথা স্বীকার করে বলেন, কিছু অভিযোগ রয়েছে যা যাচাই করা হচ্ছে। তবে ভরা মৌসুমে কাজ বন্ধ রেখে কেন কমিটি নিয়ে রাজনীতি চলছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
বাঁধের কাজে এমন ঢিলেমির জন্য দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। তারা দাবি জানিয়েছেন, অবিলম্বে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করা হোক। তা না হলে আগাম বন্যায় বোরো ফসল তলিয়ে গিয়ে কয়েক হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: