চিকিৎসকের অভাবে ধুঁকছে তাহিরপুর হাসপাতাল
চারিদিকে থইথই পানি, মাঝখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একেকটি গ্রাম। বর্ষায় উত্তাল ঢেউ আর শীতে মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত পথ—এই হলো হাওরবেষ্টিত দুর্গম তাহিরপুর উপজেলার বাস্তব চিত্র। ৩৩৬ বর্গকিলোমিটারের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় আড়াই লাখ মানুষের অসুখ-বিসুখে শেষ ভরসার নাম ‘তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’। কিন্তু যে হাসপাতালটি পাওয়ার কথা ছিল লাইফলাইনের মর্যাদা, সেটি নিজেই এখন তীব্র জনবল সংকটে ‘আইসিইউ’-তে পড়ে আছে। ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও শুধু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে অবহেলিত হাওরবাসীর জন্য এটি যেন এক দীর্ঘশ্বাসের নাম।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে অনুমোদিত ১৩৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৩ জন। অর্ধেকেরও বেশি—অর্থাৎ ৭২টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। হাসপাতালে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (গাইনি, সার্জারি, মেডিসিন, অ্যানেসথেসিয়া): ৪টি পদের সবকটিই শূন্য। আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও): ১টি পদের সেটিও খালি। মেডিকেল অফিসার: ১৭ জনের জায়গায় কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন! নার্স ও মিডওয়াইফ: ২৩টি পদের মধ্যে ৯টি পদই শূন্য। এছাড়া ল্যাব ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও ফাঁকা।
হাওরের ভাঙা পথ আর নৌকার ঝক্কি সামলে যখন একজন মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে স্বজনেরা হাসপাতালে পৌঁছান, তখন তাঁদের চোখে থাকে বাঁচবার আকুল আশা। কিন্তু হাসপাতালের নিস্প্রাণ বারান্দায় এসে সেই আশা মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায়। প্রতিদিন শতশত অসহায় মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে লাইনে দাঁড়ান, কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর অনেককেই ফিরতে হয় শূন্য হাতে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ব্যর্থ হওয়া ক্ষুব্ধ ও হতাশ আলমগীর কবির বলেন, “নামেই হাসপাতাল! এক-দুজন ডাক্তার দিয়ে এই সাগরের মতো এলাকার এত রোগী সামাল দেওয়া কি সম্ভব? অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো ডাক্তার দেখাতে পারলাম না। বিরক্ত আর কষ্ট নিয়ে ফিরে যাচ্ছি, এখন বাজার থেকে ধারদেনা করে ওষুধ কিনে খাওয়া ছাড়া উপায় নাই।”
কেবল মূল হাসপাতালই নয়, উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অবস্থাও একই রকম। সেখানেও চলছে তীব্র জনবল সংকট। ফলে পুরো উপজেলার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
অবহেলায় পড়ে আছে আধুনিক সরঞ্জাম
উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তাহিরপুর হাসপাতালের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো চালাবার মতো মানুষ নেই। দুর্গম এলাকার গরিব মানুষগুলো যাবে কোথায়? আমরা মাননীয় সংসদ সদস্যকে বিষয়টি জানিয়েছি এবং জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছি।”
হাওরাঞ্চলে চিকিৎসা দেওয়া যে কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা ফুটে উঠল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাসাদ আহমেদের কথায়। তিনি প্রথম সিলেটকে বলেন, “যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় এখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক অসহায় রোগী আসেন। কিন্তু মাত্র দুজন মেডিকেল অফিসার ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া আমাদের জন্য সত্যিই হিমশিম খাওয়ার মতো। তীব্র জনবল সংকটের মধ্যেও যে কজন আছেন, তাঁরা দিনরাত আন্তরিকভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।” তিনি জানান, শূন্যপদ পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত নিয়োগের আশ্বাস পাওয়া গেছে।
যতদিন না এই শূন্যতা কাটবে, ততদিন তাহিরপুরের আড়াই লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসার অধিকার অধরাই থেকে যাবে। হাওরের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে আসা এক-একটি পরিবারের কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে থাকবে এই হাসপাতালের বাতাস। অবহেলিত এই জনপদের মানুষের একটাই প্রশ্ন—কবে কাটবে তাঁদের এই চিকিৎসাহীনতার অন্ধকার?
শামসুল আলম আখঞ্জী/ ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: