হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের চার চা বাগানে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট

বকেয়া মজুরিসহ ৭ দফা দাবি

হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের চার চা বাগানে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট

প্রথম ডেস্ক

২৬/০৫/২০২৬ ২০:২৪:৪৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বকেয়া সাপ্তাহিক মজুরি, রেশন ও উৎসব বোনাসসহ সুনির্দিষ্ট ৭ দফা দাবিতে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার চারটি বৃহৎ চা বাগানে একযোগে অনির্দিষ্টকালের পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি ও ধর্মঘট শুরু করেছেন সাধারণ চা শ্রমিকরা; মালিকপক্ষের তীব্র আর্থিক সংকটের জেরে গত সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ না দেওয়ায় হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া, চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি ও লালচান এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগানের উৎপাদন ও प्रशासनिक কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। আন্দোলনরত চা শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ— গত ২১ মে (বৃহস্পতিবার) নিয়মিত সাপ্তাহিক তলবি বা মজুরি পরিশোধ করার পূর্বনির্ধারিত তারিখ থাকলেও ঐতিহ্যবাহী দেউন্দি টি কোম্পানি লিমিটেডের আওতাধীন এই ৪টি বাগানের কর্তৃপক্ষ আকস্মিকভাবে তা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে ৪টি বাগানের প্রায় পাঁচ হাজার চা শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার-পরিজন নিয়ে চলমান উৎসবের মৌসুমে বকেয়া টাকা না পেয়ে চরম খাদ্য ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগে পড়েছেন। অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বাগান কর্তৃপক্ষের দাবি— দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে তারা তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ২০১৮ সালের পর থেকে দেউন্দি কোম্পানির আওতাধীন এই চারটি বাগানের অনুকূলে কোনো ব্যাংক ঋণ chimneys বা মঞ্জুর করা হয়নি; এর মধ্যে নোয়াপাড়া চা বাগানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় বিগত প্রায় তিন বছর ধরে ওই কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং লালচান চা বাগানের কারখানায় একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণে কোম্পানিকে বিশাল লোকসান গুনতে হয়। গত বৃহস্পতিবার দেউন্দি টি কোম্পানি লিমিটেডের কমলগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর রহিমপুর ইউনিয়নের মিরতিংগা চা বাগান কর্তৃপক্ষের প্যাডে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নতুন করে ঋণ প্রদান না করার কারণে ২১ মে থেকে শ্রমিকদের তলব (সাপ্তাহিক মজুরি) সাময়িকভাবে বন্ধ থাকছে এবং ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ওপরই শ্রমিকদের পরবর্তী তলব দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে; একই সঙ্গে যতদিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের তলব দিতে পারবে না, ততদিন পর্যন্ত শ্রমিকদের কোনো মজুরি বহন বাগান কর্তৃপক্ষ করবে না, তবে বাগান কর্তৃপক্ষ ব্যাংক থেকে জরুরি ঋণ নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেউন্দি চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি আপন সাঁওতাল শ্রমিকদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিগত ২০২২ সাল থেকেই মালিকপক্ষ সংকটের কথা বলে শুধু ফাঁকা আশ্বাস দিয়ে আমাদের খাটিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন বা বকেয়া সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান তারা করেনি; তাই পেটের দায়ে ও অধিকার আদায়ে বাধ্য হয়ে আমরা ৪ বাগানের শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গিয়েছি এবং ৭ দফা দাবি শতভাগ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন রাজপথে কঠোরভাবে চলবে।” নোয়াপাড়া চা বাগানের ইউপি সদস্য বাবুল রেলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, চারটি বাগানেই দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ মালিকানা ও উৎপাদন সংকট চলছে এবং শ্রমিকরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ন্যায্য পাওনা সময়মতো না পাওয়ায় সোমবার থেকে এই ধর্মঘটের ডাক দেন; তবে খবর পেয়ে মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ বিন কাসেম তাৎক্ষণিকভাবে নোয়াপাড়া বাগানে ছুটে যান এবং শ্রমিক নেতা ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেন, যার প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার প্রশাসনের মধ্যস্থতায় আয়োজিত একটি বিশেষ ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আপাতত একটি সম্মানজনক সমাধানের আশা করা হচ্ছে। এদিকে, দেউন্দি টি কোম্পানি লিমিটেডের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগানের ডেপুটি ব্যবস্থাপক রেজাউল হায়াত খান (ইমন) কোম্পানির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, “এই বাগানে শ্রমিকদের পূর্বের কোনো বড় বকেয়া নেই; মূল সমস্যা হচ্ছে ব্যাংক থেকে গত বৃহস্পতিবার সময়মতো ক্যাশ টাকা উত্তোলন করা যায়নি এবং এ কারণে আমরা এই সপ্তাহের শ্রমিকদের বকেয়া মজুরির অর্ধেক টাকা আপদকালীন পরিশোধ করতে চাইলে শ্রমিকরা তা নিতে অস্বীকৃতি জানায় ও আকস্মিক আন্দোলন শুরু করে।” নোয়াপাড়া চা বাগানের প্রধান ব্যবস্থাপক সোহাগ মাহমুদ সার্বিক সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “টানা লোকসান ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৪টি বাগানই বর্তমানে চরম কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; চলমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আমরা শ্রমিকদের সাময়িকভাবে আংশিক বেতন বা খোরাকি দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলাম, কিন্তু শ্রমিকরা তা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন; বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে সমঝোতা আলোচনা চলছে এবং আমরা আশা করছি মঙ্গলবারের বৈঠকের মাধ্যমে দ্রুতই এই অচলাবস্থা ও উৎপাদন সংকট কেটে যাবে।”


এ রহমান

মন্তব্য করুন: