কিংবদন্তি তামিল চলচ্চিত্র নির্মাতা কে. ভাগ্যরাজ আর নেই
তামিল চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ লেখক কে. ভাগ্যরাজ আর নেই। শনিবার (২৭ জুন) ৭৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে তামিল চলচ্চিত্র জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ব্যতিক্রমী চিত্রনাট্য, সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্র নির্মাণ এবং নতুন ধারার গল্প বলার জন্য তিনি দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর কে. ভাগ্যরাজকে দ্রুত চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী পূর্ণিমা ভাগ্যরাজ এবং দুই সন্তান শান্তনু ও শরণ্যাকে রেখে গেছেন।
তিরুপুর জেলার ভেল্লাকোইলের বাসিন্দা ভাগ্যরাজ চলচ্চিত্রজীবন শুরু করেন পরিচালক ভি.ভি. বালাগুরুর সহকারী হিসেবে। পরে প্রযোজক এস.এ. রাজকান্নুর মাধ্যমে কিংবদন্তি নির্মাতা ভারতীরাজার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ভাগ্যরাজের অসাধারণ হস্তাক্ষর ও গল্প বলার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ভারতীরাজা তাঁকে নিজের সহকারী হিসেবে গ্রহণ করেন।
শুরুতে তিনি ‘১৬ ভায়াথিনিলে’ ও ‘সিগাপ্পু রোজাক্কল’র মতো চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। পরে ভারতীরাজার ‘পুঠিয়া ভারপুগাল’ চলচ্চিত্রে স্কুলশিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। এরপর কমল হাসান অভিনীত ‘ওরু কাইদিয়াইন ডায়েরি’র সংলাপ রচনার মাধ্যমে তিনি একজন দক্ষ চিত্রনাট্যকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা ও সম্পাদক হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন এবং ‘ভাগ্য’ নামে একটি চলচ্চিত্র সাময়িকীও পরিচালনা করেন।
কমল হাসান ও রজনীকান্তের তারকাখচিত সময়ে ভাগ্যরাজ নিজস্ব অভিনয় ও নির্মাণশৈলী দিয়ে আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন। তাঁর চলচ্চিত্রের নায়করা শক্তি নয়, বরং বুদ্ধি, কৌশল ও সাধারণ জীবনবোধ দিয়ে সমস্যার সমাধান করতেন। চশমাপরা সাধারণ মানুষের চরিত্রকে কেন্দ্র করে তিনি এমন এক নায়ক নির্মাণ করেন, যা তামিল সিনেমায় নতুন ধারা সৃষ্টি করে।
তাঁর নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ইনরু পোই নালাই ভা’, যেখানে এক তরুণীর মন জয় করতে তিন যুবকের হাস্যরসাত্মক সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। ‘ইধু নাম্মা আলু’ চলচ্চিত্রে একজন নাপিতের ছেলে ও এক ব্রাহ্মণ মেয়ের প্রেমের মাধ্যমে জাতিভেদের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়। এছাড়া ‘ডার্লিং, ডার্লিং, ডার্লিং’তে তিনি অভিনেত্রী পূর্ণিমা জয়ারামের সঙ্গে অভিনয় করেন। প্রথম স্ত্রী প্রবীণার মৃত্যুর পর পূর্ণিমাকেই তিনি বিয়ে করেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। শুভ নামের প্রচলিত ধারা এড়িয়ে তিনি ‘সুভার ইল্লাথা ছবিরাঙ্গল’, ‘ওরু কাই ওসাই’ এবং ‘থুরাল নিন্নু পোচু’র মতো ভিন্নধর্মী শিরোনাম নির্বাচন করেন।
তামিলনাড়ুর কোঙ্গু অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব তাঁর চলচ্চিত্রে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পরিচালনায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘সুভার ইল্লাথা চিত্রাঙ্গাল’ কথ্য তামিল ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
সঙ্গীত নির্বাচনেও তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে ছিলেন। ইলাইয়ারাজার জনপ্রিয়তার শীর্ষ সময়ে তিনি ‘আন্ধা ৭ নাটকাল’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রবীণ সুরকার এম.এস. বিশ্বনাথনকে দায়িত্ব দেন। সেই সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে চলচ্চিত্রটির সঙ্গীতকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন ভাগ্যরাজ। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম.জি. রামচন্দ্রনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ‘এমজিআর মাক্কাল মুন্নেত্রা কাজাগাম’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। পরে এআইএডিএমকে’তে যোগ দেন এবং ২০০৬ সালে ডিএমকের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। পরবর্তীতে তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।
অভিনয়, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে যাওয়া কে. ভাগ্যরাজের মৃত্যুতে তামিল চলচ্চিত্র অঙ্গন হারালো এক বহুমাত্রিক সৃজনশীল ব্যক্তিত্বকে। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র ও গল্প বলার অনন্য শৈলী আগামী প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: