জয়নগরে জনতার জয়
সুনামগঞ্জে ধাওয়ার পর রাতে শীর্ষ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নে মাদকবিরোধী তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে পুলিশের খাঁচায় বন্দী হয়েছে চিহ্নিত মাদক কারবারি রেজাউল করিম। বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে জয়নগর বাজারে উত্তেজিত জনতার ধাওয়া খেয়ে সে পালিয়ে গেলেও, রাতেই সুনামগঞ্জ সদর থানা পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেপ্তারকৃত রেজাউল করিম মোহনপুর ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের চানফর আলীর ছেলে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বড় ধরনের ইয়াবার চালান কেনাবেচা এবং সিন্ডিকেট পরিচালনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে সুনামগঞ্জ সদর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবু বকর সরকারি কাজে জয়নগর বাজারে যান। সেখানে তিনি একটি দোকানে বসার পর মাদক কারবারি রেজাউল করিম সুযোগ বুঝে ওই পুলিশ কর্মকর্তার সাথে বসার চেষ্টা করে। এই খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে ‘মোহনপুর মাদকপ্রতিরোধ কমিটি’ ও স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা বাজারে এসে রেজাউলকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে ধাওয়া দেয়। জনতার তীব্র তাড়া খেয়ে কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় রেজাউল।
ঘটনার পরপরই মোহনপুর মাদকপ্রতিরোধ কমিটির সেক্রেটারি ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর আলম বিষয়টি সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন এবং মাদক কারবারিদের দমনে পুলিশের দেওয়া পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে, রাতেই পুলিশ তৎপর হয়ে পলাতক রেজাউলকে গ্রেপ্তার করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রেজাউল করিমের ইয়াবা সেবন এবং বিক্রির জন্য আনা ইয়াবার একটি বড় চালানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর আগে সে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কৌশলে ‘মাদক কারবারি নয়’ মর্মে একটি চারিত্রিক প্রত্যয়নপত্র নিয়ে আড়ালে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। তবে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওই প্রত্যয়নপত্রটি বাতিল ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসী জানান, গত মার্চ মাসে গ্রামের এক সালিশি বৈঠকে রেজাউল নিজের ইয়াবা কারবারের কথা স্বীকার করে সবার সামনে ক্ষমা চায় এবং ভবিষ্যতে এই পথ পরিহার করার মর্মে একটি লিখিত মুচলেকা দেয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সে পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করে এবং মাদকবিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত প্রতিবাদী গ্রামবাসীদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোসহ প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে।
এরই প্রেক্ষিতে, গত ২০ জুন মোহনপুর গ্রামে আয়োজিত এক বিশাল মাদকপ্রতিরোধ সমাবেশে সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি রতন শেখ গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে রেজাউলকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও সে গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বুধবারের ধাওয়ার ঘটনায়।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত ২০ জুন মাদকবিরোধী সমাবেশে ওসি সাহেব নিজেই রেজাউলকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আজ (বুধবার) এলাকার মানুষ তাকে এক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে বাজারে দেখে ধাওয়া দেয়। পরে আমরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেন এবং রাতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আমরা এলাকায় সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত পরিবেশ চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ সদর থানার এএসআই আবু বকর প্রথম সিলেটকে বলেন, আমি বাজারে সম্পূর্ণ সরকারি কাজে গিয়েছিলাম। একটি দোকানে বসার পর রেজাউল নামের ওই ব্যক্তিটি নিজে থেকেই সেখানে আসে। আমি তাকে ডেকে আনিনি বা তার সাথে আমার কোনো পূর্বপরিকল্পিত বৈঠক ছিল না।
সুনামগঞ্জ সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত মাদক কারবারি রেজাউলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে এবং মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এই কঠোর অবস্থান ও চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে।
প্রীতম দাস/ সজল আহমদ
মন্তব্য করুন: