ক্যাম্পাসে তালা
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মনছুর আলমগীরের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হবিগঞ্জ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এই লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে এই অনিয়মের প্রতিবাদে এবং অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে সোমবার দুপুরে কলেজের প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
দুদকে দেওয়া অভিযোগপত্রে অধ্যক্ষ ছাড়াও কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. শরীফুর রহমান এবং রসায়ন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মো. রফি উদ্দিনের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির পাঠানো এই অভিযোগের পর থেকে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কলেজের একাধিক উন্নয়ন ও কেনাকাটা খাতে সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম 'ডায়নামিক হোস্ট বিডি'-র মাধ্যমে অনুমোদনহীন অতিরিক্ত চার্জ আদায় করা হচ্ছে এবং সেখান থেকে অধ্যক্ষ অনৈতিকভাবে ‘কমিশন’ নিচ্ছেন।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য তিনটি নতুন বাস ক্রয়ের অনুমোদন থাকলেও, কেনা হয়েছে দুটি জরাজীর্ণ পুরাতন বাস। সেগুলোও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিকল হয়ে পড়ে। লাইব্রেরি ও কলেজের ক্ষুদ্র মেরামতের অজুহাতে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা লোপাটের দাবি করা হয়েছে অভিযোগে।
অভিযোগপত্রে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও অপচয়ের দীর্ঘ খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে:
ক্রীড়া ও ইফতার তহবিল: ২০১৫ সালের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া তহবিলের অর্থ উত্তোলন করা হলেও দীর্ঘ ৬ মাসেও শিক্ষার্থীদের পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের বহিঃক্রীড়া অনুষ্ঠানটি মাত্র ৩ ঘণ্টায় শেষ দেখিয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করা হয়। একই বছর পবিত্র রমজানে ভুয়া স্বাক্ষর দিয়ে ইফতারের বাজেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ তোলার অভিযোগ রয়েছে।
ভুয়া শিক্ষা সফর ও বই ক্রয়: ডিগ্রি (পাস) কোর্সের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফর এবং বাংলা বিভাগের সেমিনারের পুস্তক ক্রয়ের অর্থ উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কোনো বই কেনা বা সফর অনুষ্ঠিত হয়নি।
আপ্যায়নে অপচয়: ২০১৫ সালের একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান অতিথি করে, তাঁর পরিবারসহ একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেলে রাত্রিপাপনের ব্যবস্থা করে কলেজের তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় করা হয়।
শোক দিবসে পিকনিক: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক চলাকালীন সময়ে অধ্যক্ষ ও তাঁর সহযোগীরা একটি স্থানীয় রিসোর্টে শিক্ষক পরিষদের পিকনিকের আয়োজন করে রাষ্ট্রীয় শোকের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও জানানো হয়, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রফি উদ্দিন চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করার পরও প্রতিদিন নিয়মিতভাবে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। তিনি উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের সাথে যোগসাজশ করে কলেজের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছেন। এই চক্রটি জুন মাসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য ঢাকায় তদবির চালাচ্ছে বলেও অভিযোগকারী দাবি করেন।
উত্থাপিত এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রশাসনিক ভবনের কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং 'অনির্দিষ্টকালের জন্য তালাবদ্ধ থাকবে' মর্মে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়।
সাধারণ শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সচেতন মহল ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিমুক্ত করতে দুদকের দ্রুত ও কার্যকরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মনছুর আলমগীরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: