শাহজালাল (র.) মাজারে ‘দানবাক্স বিতর্ক’: নেপথ্যে ‘বকরি খোকন’
সিলেটের আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে দানের টাকা লুটপাটের অভিযোগ এবং এর ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট নানা ঘটনায় তোলপাড় চলছে পুরো সিলেটজুড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে মাজারের খাদেমদের দায়ী করে একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে তুমুল সমালোচনা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। মাজারের দানবাক্সের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি দানবাক্সগুলোতে সরকারিভাবে তালা লাগিয়ে দেন। এই ঘটনার পর পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়ায় উত্তাল হয়ে ওঠে সিলেট। এর জের ধরে একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে তাঁর প্রত্যাহারের পরও মাজারের অর্থ আত্মসাতের আলোচনা থামেনি।
কোনো কোনো গণমাধ্যমে এককভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করে প্রচার-প্রচারণা চালানো হলে, এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাজারের টাকা বণ্টনের একটি গোপন তালিকাও ফাঁস হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের অর্থ ও সামগ্রী ব্যবস্থাপনার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি ‘কালো হাত’। এর মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী ও দোর্দণ্ড দাপটশালী ব্যক্তি হলেন খোকন, যিনি মাজার সংশ্লিষ্টদের কাছে ‘বকরি খোকন’ নামে পরিচিত।
প্রাথমিকভাবে খোকন মাজারে মানত হিসেবে আসা ছাগল, খাসি ও গরু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পান। সেখান থেকেই মূলত তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তির শুরু এবং ‘বকরি খোকন’ নামের উৎপত্তি। পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর খোকনের নজর পড়ে মাজারের রান্নার বড় ডেগগুলোর ওপর।
মাজারের বংশানুক্রমিক কোনো খাদেম না হয়েও খোকন বর্তমানে মাজারের ডেগ ও অর্থ ব্যবস্থাপনার অঘোষিত ‘ম্যানেজার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিন মাজারের দানবাক্স ও অন্যান্য খাত থেকে আসা সমস্ত টাকা তাঁর কাছেই জমা হয়। তিনিই সেই টাকা গণনা করে বিভিন্ন মহলে বণ্টন করেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
সাধারণ একজন কর্মচারী হিসেবে মাজারে যোগদান করেছিলেন খোকন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে মাজারের খাদেমদের একাংশের অন্ধ আস্থা অর্জন করে তিনি আজ অনেক মূল খাদেমের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি সম্পদশালী হয়ে উঠেছেন। মাজারের প্রায় পুরো খাদেম সিন্ডিকেটই এখন এই খোকনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
খোকনের এই জাদুকরী উত্থানে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে সিলেট শহরের ভেতরেই ‘বকরি খোকন’-এর বিলাসবহুল বাড়িসহ একাধিক স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। এছাড়া সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কাজীরবাজারে তাঁর রয়েছে বিশাল ছাগল ও পশুর ব্যবসা। মাজারের অর্থকে পুঁজি করেই তিনি এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে খোদ মাজার সংশ্লিষ্টরাই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
মাজারের পবিত্রতা রক্ষা এবং ভক্তদের দানের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ।
সজল আহমদ
মন্তব্য করুন: