ইউরোপের স্বপ্নে সাগরযাত্রা: হবিগঞ্জের ৩৮ জনের খোঁজ নেই

ইউরোপের স্বপ্নে সাগরযাত্রা: হবিগঞ্জের ৩৮ জনের খোঁজ নেই

নিজস্ব প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ

০৫/০৭/২০২৬ ১২:০৮:৩৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নের মূল্য দিতে গিয়ে বাংলাদেশের বহু পরিবার তাদের স্বজনদের হারিয়েছে। কারও ঘরে গত আট মাস ধরে চলছে অন্তহীন অপেক্ষা, আবার কারও জীবনে নেমে এসেছে স্বজন হারানোর তীব্র শোক। হবিগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের কাছে ইউরোপগামী সমুদ্রপথ এখন আর শুধু বিদেশযাত্রার স্বপ্ন নয়; এটি মানব পাচার এবং সাগরে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য প্রাণের এক বেদনাদায়ক স্মৃতি।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপোলি উপকূল থেকে ইতালির উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকায় থাকা হবিগঞ্জের অন্তত ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ আরোহীর কোনো সন্ধান আজও মেলেনি। এর মধ্যেই চলতি বছরের জুনে লিবিয়া থেকে গ্রিসগামী আরেকটি রাবারের নৌকা ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন চার বাংলাদেশি। ৪৬ জন আরোহী নিয়ে ডুবতে থাকা ওই নৌকার যাত্রীদের অধিকাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। নিখোঁজদের মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া একজন হলেন হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সীমা সরকারের ছেলে নিবিড় সরকার অভি (১৮)। অন্যরা হলেন সিলেটের বকুল ঋষি, রংপুরের সালাউদ্দিন এবং বরিশালের জিয়াউর রহমান।


এই ঘটনায় অলৌকিকভাবে উদ্ধার হয়েছেন আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের ফাহিম তালুকদার, সানি তালুকদার ও আবু বকর তালুকদার। তাঁরা প্রত্যেকে দালাল চক্রকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। উদ্ধার হওয়া আবু বকর তালুকদার বর্তমানে গ্রিসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি জানান, গত ৭ জুন লিবিয়া থেকে যাত্রা শুরুর পর গ্রিস উপকূল থেকে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার দূরে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এরপর ১১ দিন সাগরে ভাসার পর ১৮ জুন গ্রিস কোস্ট গার্ড উদ্ধার অভিযান শুরু করলে আতঙ্কে সবাই একদিকে জড়ো হয়ে পড়েন। এতে রাবারের নৌকাটি ডুবে যায় এবং চার বাংলাদেশিসহ ছয়জন সাগরে তলিয়ে যান।


নিখোঁজ অভির মামা বিপ্লব সরকার অভিযোগ করেন, "দালালরা কাঠের নৌকায় পাঠানোর আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত রাবারের নৌকায় যাত্রীদের তুলে দেয়। আমাদের বলা হয়েছিল অভি নিরাপদে পৌঁছেছে, সেই আশ্বাসেই দালালরা ১৩ লাখ টাকা নেয়। পরে জানা যায়, অভি আর বেঁচে নেই।"


অন্যদিকে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের নিখোঁজের ঘটনাটি এখনো রহস্যাবৃত। সেদিন লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে ইতালির উদ্দেশে চারটি নৌকা রওনা দিলেও একটি নৌকার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ওই নৌকায় হবিগঞ্জ সদর, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলার অন্তত ৩৮ জন ছিলেন। বাংলাদেশ দূতাবাস বা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা কোথাও তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি। লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব মো. রাসেল মিয়া জানান, অবৈধভাবে লিবিয়ায় প্রবেশ করায় এসব ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে থাকে না। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও সন্ধান না মেলায় তাঁদের সাগরে সলিলসমাধি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


স্থানীয় সূত্র জানায়, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী হাসান মোল্লার মাধ্যমে ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে অনেক তরুণ ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় মানব পাচার, হত্যা ও মরদেহ গুমের অভিযোগে বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও মূলহোতারা এখনো অধরা।


হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল হক খান বলেন, "দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মূল অভিযুক্তদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।" একই সঙ্গে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ জানান, ঘটনা দুটির বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তানজুমা তাবাসসুম

মন্তব্য করুন: