নৌকার হাল ধরেই সংসারের গ্লানি টানছেন সুনামগঞ্জের সুমিত্রা
সংসারের গ্লানি টানতে সাত বছর ধরে নৌকা চালিয়ে জীবন কাটছে শাল্লার সুমিত্রা দাসের। স্বামী হারানোর পর দু’চোখে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল, তখন সন্তানদের জন্য নিজ হাতে বৈঠাকেই জীবনের অবলম্বন করে নিলেন তিনি। এভাবেই জলে গেছে সুমিত্রার জীবনের সাতটি বছর। প্রতিদিন নদী পাড়ি দিয়ে মানুষ পারাপার করছেন তিনি। দুঃখের কিছুটা অবসান ঘটলেও অভাব-অনটনের নির্মম বাস্তবতা এখনো তার নিত্যসঙ্গী।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ৩ নম্বর বাহাড়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা সুমিত্রা রানী দাসের স্বামী সুখেন দাস প্রায় সাত বছর আগে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে সংসারের একমাত্র অবলম্বন। তিন মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় টিকে থাকার কঠিন লড়াই। ছেলে সন্তান না থাকায় সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নেন সুমিত্রা।
তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা। তিনিও এখন মায়ের সঙ্গেই থাকেন। পরিবারের পাঁচজনের খাবার জোগাড়ের একমাত্র ভরসা সুমিত্রার খেয়া নৌকা।
সরেজমিনে রঘুনাথপুর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নিরলসভাবে যাত্রী পারাপার করছেন তিনি। প্রচণ্ড রোদ, ঝড় কিংবা বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারে না। কারণ, একদিন নৌকা না চালাতে পারলেই পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলে না।
চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও জীবনের কাছে হার মানেননি সুমিত্রা। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, সরকার আমাকে একটি ঘর ও থাকার জন্য একটু জায়গা দিয়েছে। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু শুধু ঘর থাকলেই তো হয় না, ঘরে খাবারও থাকতে হয়। তাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খেয়া পারাপার করি। ঝড়-বৃষ্টি হলে নৌকা চালাতে পারি না, তখন আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়।
তিনি আরও বলেন, আমি চাই সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ আমার পরিবারের দিকে একটু নজর দিন। আমার তিন মেয়েকে নিয়ে যেন সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন অসহায় নারী হয়েও সুমিত্রা রানী দাস যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে সাত বছর ধরে বৈঠা হাতে পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। তবে তার এই সংগ্রাম কেবল প্রশংসায় সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।
স্বামী হারানোর শোক হয়তো সময়ের সঙ্গে কিছুটা ম্লান হয়েছে, কিন্তু অভাবের নির্মম বাস্তবতা আজও সুমিত্রার পিছু ছাড়েনি। প্রতিদিন বৈঠার প্রতিটি টানে তিনি যেন লিখে চলেছেন এক সংগ্রামী মায়ের বেঁচে থাকার গল্প।
নিশিকান্ত সরকার / ডিডি
মন্তব্য করুন: